আরাশের স্কুলে অভিভাবক সভা। আমি গিয়েছি অন্য বাবাদের সাথে বসতে। কিন্তু বসার সাথে সাথেই মনে হলো, আমি এখানে পড়ে গেছি। আমি এই জায়গার উপযুক্ত নই।
চারপাশে সব বাবারা স্যুট-টাই পরে এসেছেন। আমি এসেছি জিন্স-শার্ট পরে। তাদের গাড়ি পার্কিং এ দামি গাড়ি। আমি এসেছি রিকশায়।
শিক্ষক একে একে বাচ্চাদের নাম ধরে ডাকছেন। প্রতিটি নামের সাথে অভিভাবকদের পরিচয় দিচ্ছেন।
“আহমেদ সাহেবের ছেলে, উনি একটা বড় কোম্পানির পরিচালক।”
“খান সাহেবের মেয়ে, উনি একজন ডাক্তার।”
“রহমান সাহেবের ছেলে, উনি ইঞ্জিনিয়ার।”
তারপর এলো আরাশের নাম।
“আরাশ, হায়দার সাহেবের ছেলে। উনি… উনি লেখালেখি করেন।”
শিক্ষকের কণ্ঠে একটা দ্বিধা। যেন লেখালেখি কোনো পেশাই নয়। যেন এটা সময় কাটানোর একটা উপায় মাত্র।
আমি নিজেকে ছোট মনে হলো। আমার পরিচয় কী? আমি কী করি? আমার কোনো স্পষ্ট পদবি নেই। কোনো অফিস নেই। কোনো নির্দিষ্ট বেতন নেই।
শিক্ষক বললেন, “আরাশ পড়াশোনায় ভালো। কিন্তু তার অতিরিক্ত কার্যক্রমে অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন।”
অন্য বাবারা জিজ্ঞেস করছেন, “কোন ধরনের অতিরিক্ত কার্যক্রম?”
“খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিতর্ক প্রতিযোগিতা।”
আমি জানি এসব কার্যক্রমে অংশ নিতে টাকা লাগে। পোশাক লাগে। যাতায়াত খরচ লাগে। যা আমার সাধ্যের বাইরে।
কিন্তু আমি এটা বলতে পারি না। লজ্জায় মাথা নিচু করে বসে থাকি।
একজন বাবা বললেন, “আমার ছেলেকে পিয়ানো শেখাচ্ছি। আপনারা কী করাচ্ছেন?”
আরেকজন বললেন, “আমার মেয়ে সাঁতার শিখছে। এছাড়া ইংরেজি বলা শেখাচ্ছি।”
সবাই তাদের সন্তানদের জন্য কত কিছু করছেন! আমি আরাশের জন্য কী করছি? শুধু স্কুলের বই কিনে দিচ্ছি। খাওয়া-পরা দিচ্ছি।
কিন্তু এটাই কি যথেষ্ট? আরাশের প্রতিভা বিকাশের জন্য আমি কী করতে পারছি?
শিক্ষক বললেন, “আগামী মাসে একটা শিক্ষা সফর আছে। খরচ পাঁচ হাজার টাকা।”
আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল। পাঁচ হাজার টাকা আমার কাছে বিরাট অঙ্ক। কিন্তু অন্য অভিভাবকরা অনায়াসে মাথা নাড়লেন।
আমি ভাবলাম, আরাশকে কী বলব? ও যদি জানতে চায় কেন ও যেতে পারবে না?
সভার পর অন্য বাবারা নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন। তাদের ব্যবসার কথা। গাড়ির কথা। বাড়ির কথা।
আমি একা দাঁড়িয়ে ছিলাম। কারো সাথে আমার কোনো মিল নেই। আমি তাদের কথায় অংশ নিতে পারছি না।
একজন বাবা আমার কাছে এলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কোন কোম্পানিতে কাজ করেন?”
আমি বললাম, “আমি লেখালেখি করি।”
উনি একটু অবাক হয়ে বললেন, “ও, ভালো তো। কোন পত্রিকায়?”
আমি বলতে পারলাম না যে আমি ফ্রিল্যান্স কাজ করি। কখনো কাজ আছে, কখনো নেই।
উনি বললেন, “আমার একটা প্রিন্টিং প্রেস আছে। কোনো কাজ থাকলে জানাবেন।”
উনার সৌজন্য ভালো লাগল। কিন্তু একটা করুণার ভাব ছিল। যেন আমি সাহায্যের মুখাপেক্ষী।
ঘরে ফিরে আরাশকে দেখি পড়তে বসেছে। আমার মনে হলো, আমি আরাশের জন্য যথেষ্ট করতে পারছি না।
অন্য বাবারা তাদের সন্তানদের সব সুবিধা দিতে পারেন। আমি পারি না।
কিন্তু আমি আরাশকে যা দিতে পারি, সেটা হলো ভালোবাসা। সময়। মনোযোগ।
আমি আরাশের সাথে বেশি সময় কাটাই। তার সাথে গল্প করি। তার স্বপ্নের কথা শুনি।
হ্যাপি বলল, “সভায় কী হলো?”
আমি বললাম, “ভালো ছিল।” কিন্তু আমার মন ভালো ছিল না।
আমি ভাবলাম, সফলতার মাপকাঠি কী? টাকা? পদবি? সামাজিক মর্যাদা?
নাকি সফলতার মাপকাঠি হলো সন্তানের সাথে সম্পর্ক? তার মানসিক বিকাশ? তার মূল্যবোধ?
আমি হয়তো আরাশকে পিয়ানো শেখাতে পারছি না। কিন্তু আমি তাকে জীবনের গান শেখাচ্ছি।
আমি হয়তো তাকে সাঁতার শেখাতে পারছি না। কিন্তু আমি তাকে জীবনের স্রোতে ভেসে থাকার কৌশল শেখাচ্ছি।
আমার সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার হলো একজন বাবা যে তার কথা শোনে। যে তাকে ভালোবাসে। যে তাকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চায়।
এই উপহার টাকা দিয়ে কেনা যায় না।
একটু ভাবনা রেখে যান