ফোনটা হাতে নিয়ে ডায়াল করার সময় গলায় একটা খসখসানি অনুভব করলাম। দপ্তরের সাহেবের সাথে কাল দেরিতে আসার ব্যাপারে কথা বলতে হবে। রিং হচ্ছিল। একবার, দুইবার, তিনবার। চতুর্থ রিংয়ে উঠলেন।
“আস্সালামু আলাইকুম সাহেব, আমি হায়দার…”
কিন্তু যেই কথা বলতে গেলাম, গলা দিয়ে কোনো আওয়াজই বের হলো না। একেবারে নিঃশব্দ। যেন কণ্ঠস্বর কোথাও হাওয়ায় মিশে গেছে। মুখ খুলেছি, শ্বাস বের হচ্ছে, কিন্তু কোনো শব্দ নেই।
“হ্যালো? কে বলছেন?” সাহেবের গলায় বিরক্তি।
আমি আবার চেষ্টা করলাম। মুখ খুললাম, জিভ নড়লাম, কিন্তু কিছুই না। একটা ভয়ংকর নিস্তব্ধতা। যেন আমার ভেতরে থাকা সব কথা, সব আবেগ, সব যুক্তি একসাথে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।
ফোন কেটে দিলেন সাহেব।
বসে রইলাম ফোন হাতে নিয়ে। হ্যাপি রান্নাঘর থেকে ডাকছিল, “কী হলো? কথা হলো?” কিন্তু আমি উত্তর দিতে পারছি না। আরাশ বারান্দা থেকে এসে জিজ্ঞেস করল, “আব্বু, কি হয়েছে তোমার?” আমি শুধু তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
এই কি আমার পরিচয়? একজন মানুষ যার কণ্ঠ নেই?
ছোটবেলায় মনে হতো কথা বলাটাই সবচেয়ে সহজ কাজ। মুখ খুলেছি আর কথা বের হয়েছে। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে বুঝলাম, কথা বলা মানে শুধু শব্দ তৈরি করা নয়। কথা বলা মানে নিজেকে প্রকাশ করা। আর আজকাল মনে হয় আমার ভেতরে যা আছে, তা প্রকাশের ভাষা খুঁজে পায় না।
চাকরিতে গিয়ে যখন বলি “আমার একটা মতামত আছে”, তখন সবাই এমনভাবে তাকায় যেন আমি কোনো অদ্ভুত ভাষায় কথা বলছি। বাসায় এসে হ্যাপিকে বলি, “আজ দপ্তরে এরকম একটা ঘটনা ঘটলো”, তখন সে শোনে বটে, কিন্তু আমার কথার গভীরতা বুঝতে পারে না। আরাশের সাথে গভীর কোনো কথা বলতে গেলে দেখি সে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে।
আমার কণ্ঠ আছে, কিন্তু কেউ শুনতে পায় না। আমার ভাষা আছে, কিন্তু কেউ বুঝতে পারে না। আমার চিন্তা আছে, কিন্তু কারো সাথে মেলে না।
হয়তো এই জন্যই আজ টেলিফোনে কথা বলতে গিয়ে কণ্ঠ হারিয়ে ফেলেছি। অনেকদিন ধরে যে কণ্ঠ কেউ শুনছিল না, সেটা হয়তো নিজেই নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে।
রাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মুখ খুলে দেখলাম। সব ঠিক আছে। জিভ আছে, গলা আছে, দাঁত আছে। কিন্তু আমার আসল কণ্ঠ কোথায়? যে কণ্ঠে আমার সত্য কথাগুলো ছিল, যে কণ্ঠে আমার স্বপ্নগুলো ছিল, যে কণ্ঠে আমার প্রশ্নগুলো ছিল?
আল্লাহ, আমি কি এমন একটা পৃথিবীতে এসেছি যেখানে সৎ মানুষের কণ্ঠ শোনা যায় না? যেখানে চোর-বেইমানদের আওয়াজ উঁচু, আর সত্যবাদীরা নিঃশব্দ?
নাকি আমার সমস্যা অন্য কোথাও? হয়তো আমি এতদিন ভুল ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করেছি। হয়তো সত্যিকারের কথা বলার জন্য আগে নিজের সাথে সৎ থাকতে হয়।
ফোনটা আবার হাতে নিলাম। এবার অন্য নম্বর ডায়াল করলাম। নিজের নম্বর। নিজেকে ফোন করলাম।
“হ্যালো?” বললাম নিজেকে।
এবার কণ্ঠ ফিরে এসেছে।
একটু ভাবনা রেখে যান