আজ সকালে হাসপাতালে দেখি একটা নবজাতক শিশু। সবেমাত্র জন্মেছে, কিন্তু তার চোখে এমন একটা ভাব যেন সে অনেক কিছু জানে। যেন সে অনেক দূর থেকে এসেছে। আমি ভাবলাম – এই শিশু কি কিছু মনে রাখে তার জন্মের আগের কথা? আমরা কোথা থেকে আসি এই পৃথিবীতে?
বাজারে দেখি একটা বাচ্চা প্রথমবার কলা দেখে চিনে ফেলেছে। কেউ শেখায়নি, কিন্তু জানে এটা খাবার। এই জানা কোথা থেকে আসে? নাকি আমাদের ভেতরে আগে থেকেই কিছু জ্ঞান লুকিয়ে থাকে?
পার্কে দেখি একটা দুই বছরের শিশু সঙ্গীত শুনে তাল দিচ্ছে। কেউ শেখায়নি ছন্দ, কিন্তু সে জানে। এই ছন্দবোধ কি তার জন্মের আগে থেকেই ছিল? নাকি সঙ্গীত এমনই একটা ভাষা যা সবার ভেতরে আছে?
রাস্তায় দেখি একজন অন্ধ বৃদ্ধ হাতে পথ খুঁজে খুঁজে হেঁটে যাচ্ছেন। তিনি জানেন কোনদিকে যেতে হবে। এই দিক-জ্ঞান কোথা থেকে? নাকি আমাদের আত্মার একটা কম্পাস আছে?
আমার মনে হয়, আমরা এই পৃথিবীতে একবারেই প্রথম আসিনি। আমাদের ভেতরে এমন অনেক জিনিস আছে যা শেখা নয়, জানা। আমরা জন্মের সাথে সাথে কিছু নিয়ে আসি – ভালোবাসার ক্ষমতা, সৌন্দর্যের অনুভূতি, ন্যায়-অন্যায়ের বোধ।
চায়ের দোকানে বসে দেখি একটা শিশু প্রথমবার আকাশ দেখে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। যেন চাঁদকে ছুঁতে চায়। এই আকাশের প্রতি আকর্ষণ কোথা থেকে? নাকি আমরা আকাশ থেকেই এসেছি?
ট্রেনে দেখি একটা বাচ্চা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। তার চোখে এমন একটা ভাব যেন সে কিছু খুঁজছে। কিছু চেনা জায়গা খুঁজছে। যেন সে এই পথ আগেও চিনত।
হাসপাতালের প্রসূতি ওয়ার্ডে দেখি নবজাতকরা কাঁদে। কিন্তু কেন কাঁদে? ক্ষুধার জন্য? নাকি হারিয়ে যাওয়া কিছুর জন্য? যেন তারা কোনো সুখের জায়গা ছেড়ে এসেছে।
ইসলামে বলে, আমরা জন্মের আগে আল্লাহর কাছে ছিলাম। রূহের জগতে ছিলাম। আল্লাহ জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আমি কি তোমাদের রব নই?” আমরা বলেছিলাম, “হ্যাঁ।” এই স্মৃতি কি আমাদের ভেতরে আছে?
নাকি আমরা আগের জন্মের মানুষ? আমাদের কর্মফলের হিসেব নিয়ে এই জীবনে এসেছি? আমার ভেতরে যে ভালোবাসার টান, সেটা কি আগের কোনো জন্মের সম্পর্কের টান?
মসজিদে শুনি ইমাম সাহেব বলছেন, “আমরা মাটি থেকে সৃষ্টি।” কিন্তু মাটিতে কি আত্মা থাকে? নাকি আল্লাহ আলাদাভাবে আত্মা দিয়েছেন? আর সেই আত্মা কোথা থেকে এসেছে?
বাসে দেখি একটা বাচ্চা তার মায়ের গলা জড়িয়ে ধরেছে। যেন চিরকাল চেনে। এই চেনা কোথা থেকে? নাকি মা আর সন্তানের সম্পর্ক জন্মের আগে থেকেই নির্ধারিত?
রাস্তায় দেখি দুটো শিশু প্রথমবার দেখা হওয়ার পরেই বন্ধু হয়ে গেছে। এই তাৎক্ষণিক সংযোগ কেন? নাকি তারা আগে থেকেই চিনত?
আমার মনে হয়, জন্মের আগে আমরা হয়তো একটা বিশাল চেতনার অংশ ছিলাম। সেখানে আলাদা আলাদা সত্তা ছিলাম না, ছিলাম এক। তারপর এই পৃথিবীতে এসে আলাদা হয়ে গেছি। কিন্তু সেই একত্বের স্মৃতি আমাদের ভেতরে আছে।
তাই আমরা ভালোবাসি, কারণ মনে আছে আমরা এক ছিলাম। তাই আমরা একা বোধ করি, কারণ মনে আছে আমরা সবার সাথে ছিলাম। তাই আমরা ঘর খুঁজি, কারণ মনে আছে আমাদের একটা ঘর ছিল।
চায়ের দোকানে শুনি একজন বলছেন, “এই বাচ্চাটা আমার মতো দেখতে।” কিন্তু মানুষ কেন একরকম দেখতে হয়? এই মিল কোথা থেকে? নাকি আমরা সবাই একই উৎস থেকে এসেছি?
পার্কে দেখি বাচ্চারা মাটি দিয়ে খেলছে। যেন মাটির সাথে তাদের পুরনো পরিচয় আছে। ইসলাম বলে আমরা মাটি থেকে এসেছি, মাটিতেই ফিরে যাব। এই মাটির প্রতি আকর্ষণ কি সেই কারণে?
আমার মনে হয়, জন্মের আগে আমরা যেখানেই ছিলাম, সেখানে ভালোবাসা ছিল। কারণ প্রতিটা শিশু জন্মের সাথে সাথে ভালোবাসার খোঁজ করে। সেখানে শান্তি ছিল, কারণ আমরা শান্তির জন্য আকুল।
নাকি আমরা স্রেফ শূন্য থেকে এসেছি? আমাদের চেতনা কি শুধুমাত্র মস্তিষ্কের কার্যক্রম? তাহলে ভালোবাসা, সৌন্দর্যবোধ, নৈতিকতা – এগুলো কোথা থেকে?
হাসপাতালে দেখি একটা কোমায় থাকা রোগী। তার শরীর আছে, কিন্তু চেতনা নেই। চেতনা কোথায় গেল? এটা কি শরীরের অংশ, নাকি আলাদা কিছু?
আমার মনে হয়, আমাদের অস্তিত্ব শুধু এই জীবনে সীমাবদ্ধ নয়। আমরা এসেছি কোথাও থেকে, যাবো কোথাও। এই জীবন একটা সেতু, গন্তব্য নয়।
জন্মের আগে আমরা কোথা থেকে এসেছি – এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আমাদের ভেতরেই লুকিয়ে আছে। আমাদের প্রতিটি আকাঙ্ক্ষায়, প্রতিটি স্বপ্নে, প্রতিটি ভালোবাসায়।
এই লেখাটা লিখতে লিখতে আমার মনে হচ্ছে, হয়তো আমি সেই অস্তিত্বের খোঁজেই এসব প্রশ্ন করছি। যে অস্তিত্ব আমার জন্মের আগে ছিল, মৃত্যুর পরেও থাকবে।
একটু ভাবনা রেখে যান