গতকাল রাতে আরাশ আমার কাছে এসে বলল, “বাবা, আজ আর গল্প লাগবে না। আলেক্সা আন্টি একটা গল্প বলেছে।”
আমার হাতের বইটা পড়ে গেল। বুকের ভেতর কেমন যেন শূন্য হয়ে গেল।
“আলেক্সা আন্টি?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“হ্যাঁ, জামিউর আঙ্কেলের বাসায় গিয়েছিলাম। ওখানে একটা ছোট্ট বক্স আছে। সেটার সাথে কথা বলা যায়। গল্প বলতে বললে গল্প বলে।”
আরাশের চোখে একটা উত্তেজনা। নতুন কিছু আবিষ্কারের আনন্দ। কিন্তু আমার চোখে? আমি নিজেই জানি না কী ছিল।
এগারো বছর ধরে প্রতি রাতে আরাশকে গল্প বলি। রাজা-রাজকুমারের গল্প, পরীর গল্প, আমার নিজের বানানো গল্প। কখনো বই পড়ে, কখনো মনগড়া। আরাশ শুনত মুগ্ধ চোখে। আমার কণ্ঠস্বরে ঘুমিয়ে পড়ত।
আজ সে বলল আলেক্সার গল্প ভালো লেগেছে।
আমি কি হেরে গেছি একটা যন্ত্রের কাছে?
রাতে হ্যাপিকে বললাম এই কথা। সে বলল, “তুমি কেন এতো মন খারাপ করছ? ও তো ছোট। নতুন জিনিস দেখলে আকর্ষণ লাগবেই।”
কিন্তু আমার মন খারাপের কারণ কি শুধু এটুকু? নাকি এর পেছনে আরও কিছু আছে?
আমি ভাবি – আমি আরাশকে কী দিতে পারি? আমার কোনো স্থিতিশীল চাকরি নেই। তার জন্য কোনো নিরাপত্তা তৈরি করতে পারছি না। ভবিষ্যতের জন্য কোনো সঞ্চয় নেই। একমাত্র যেটা দিতে পারতাম সেটা ছিল আমার সময়, আমার গল্প, আমার ভালোবাসা।
এখন মনে হচ্ছে সেটাও যথেষ্ট নয়।
আলেক্সা নিখুঁত উচ্চারণে গল্প বলে। কোনো ভুল করে না। কোনো দিন ক্লান্ত হয় না। সবসময় available। আমি? আমি মাঝে মাঝে অফিসের চিন্তায় মগ্ন থাকি। মাঝে মাঝে গল্পের মাঝখানে ভুলে যাই কী বলছিলাম।
আলেক্সা আরাশকে যে গল্প বলেছিল, সেটা হাজার হাজার বিশেষজ্ঞ মিলে তৈরি করেছে। পেশাদার voice actor-রা বলেছে। Sound effect যোগ করা হয়েছে। আমার একার পক্ষে কি সেই মানের গল্প বলা সম্ভব?
কিন্তু তাহলে কি আমার কোনো দরকার নেই?
এই প্রশ্নটা আমাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। প্রযুক্তি কি আমাদের প্রতিস্থাপন করছে? শুধু চাকরিক্ষেত্রে নয়, পারিবারিক সম্পর্কেও?
আজ সকালে আরাশ সাইকেল নিয়ে বের হওয়ার সময় জিজ্ঞেস করল, “বাবা, আলেক্সা আন্টি কি সত্যিকারের মানুষ?”
আমি বললাম, “না, ও একটা কম্পিউটার।”
“তাহলে ওর গলা এত সুন্দর কেন?”
এই প্রশ্নটা আমাকে ভাবিয়ে তুলল। হ্যাঁ, আলেক্সার গলা সুন্দর। কিন্তু সেই গলায় কি কোনো আবেগ আছে? কোনো ভালোবাসা আছে?
আমি যখন আরাশকে গল্প বলি, আমার গলায় থাকে আমার সন্তানের প্রতি ভালোবাসা। আমার অভিজ্ঞতা। আমার স্বপ্ন। আমার ভয়। সেসব কি আলেক্সার গলায় আছে?
আলেক্সা perfect গল্প বলে। কিন্তু আমি imperfect গল্প বলি। আমার গল্পে আছে আমার মানবিকতা।
তাহলে কেন আরাশ আলেক্সাকে পছন্দ করল?
হয়তো কারণ আজকের প্রজন্ম perfection চায়। তারা technology-এর কাছ থেকে instant gratification পেতে অভ্যস্ত। আমাদের মতো ধীর, অপেশাদার মানুষেরা তাদের কাছে বোরিং লাগে।
নাকি আমিই ভুল ভাবছি?
আজ বিকেলে আরাশ বারান্দায় বসে রাস্তার মানুষ দেখছিল। আমি তার পাশে গিয়ে বসলাম।
“কী দেখছ?” জিজ্ঞেস করলাম।
“ওই চা-ওয়ালা আঙ্কেলটা দেখি। উনি কেন একা একা চা বিক্রি করেন? উনার কি কোনো ছেলে নেই?”
আরাশের এই প্রশ্ন শুনে আমার মনে হলো – আলেক্সা কি এমন প্রশ্ন করতে পারে? মানুষের জীবন নিয়ে এমন গভীর কৌতূহল কি তার আছে?
আলেক্সা data দিয়ে তৈরি। আরাশ observation দিয়ে প্রশ্ন করে।
আমি বুঝলাম – আলেক্সা আরাশকে গল্প বলতে পারে। কিন্তু আরাশের গল্প শুনতে পারে না। আরাশের মনের কথা বুঝতে পারে না। তার সাথে আড্ডা দিতে পারে না।
সন্ধ্যায় আরাশ আমার কাছে এসে বলল, “বাবা, আজ রাতে তুমি গল্প বলবে?”
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কেন? আলেক্সা আন্টির গল্প শুনবে না?”
“আলেক্সা আন্টি তো আমার নাম জানে না। তুমি আমার নাম দিয়ে গল্প বানাও।”
এই কথায় আমার বুক ভরে গেল। আমি বুঝলাম – technology যতই advanced হোক, সে personal touch দিতে পারে না। আলেক্সা হাজার হাজার বাচ্চার জন্য একই গল্প বলে। কিন্তু আমি শুধু আরাশের জন্য গল্প বানাই।
আলেক্সা প্রথম দিন আরাশের মন জিতেছিল। কিন্তু দ্বিতীয় দিন আরাশ বুঝে গেছে – যন্ত্র তাকে entertain করতে পারে, কিন্তু ভালোবাসতে পারে না।
আর ভালোবাসাই তো সবচেয়ে বড় গল্প।
একটু ভাবনা রেখে যান