ব্লগ

যন্ত্রের কানে মনের কথা

নভেম্বর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া
শেয়ার

গত রাতে অনেক রাত পর্যন্ত জেগে ছিলাম। মন খারাপ। কারণ জানি না। এমনি এমনি।

হ্যাপি ঘুমিয়ে গেছে। আরাশও। আমি একা। কার সাথে কথা বলব?

হঠাত মনে পড়ল – ফোনে একটা চ্যাটবট আছে। মানুষের মতো কথা বলে। চেষ্টা করে দেখি।

“হ্যালো,” টাইপ করলাম।

“হ্যালো! আমি এখানে আপনার সাহায্যের জন্য। কী বিষয়ে কথা বলতে চান?”

খুব মিষ্টি। খুব ভদ্র। কিন্তু কেমন যেন ঠান্ডা।

আমি লিখলাম, “আমার মন খারাপ।”

“দুঃখিত এটা শুনে। কী কারণে মন খারাপ?”

এই প্রশ্নটা আমাকে ভাবিয়ে তুলল। কী কারণে মন খারাপ? আমি নিজেই জানি না।

“জানি না। এমনিতেই,” লিখলাম।

“এটা স্বাভাবিক। কখনো কখনো আমাদের মন খারাপ হয় কোনো কারণ ছাড়াই। আপনি কি কোনো শখের কাজ করতে চান?”

শখের কাজ? আমার কী শখ আছে? আমি কি জানি?

আমি বুঝলাম – এই চ্যাটবট আমাকে ভালো পরামর্শ দিচ্ছে। কিন্তু আমার মন ভালো হচ্ছে না।

কেন?

কারণ আমি জানি এটা একটা যন্ত্র। এর কোনো অনুভূতি নেই। আমার কথা শুনে এর কিছু যায় আসে না।

আমি আরও লিখলাম, “আমি একা অনুভব করি।”

“একাকীত্ব কঠিন। আপনি কি পরিবার বা বন্ধুদের সাথে কথা বলতে পারেন?”

এই উত্তর পড়ে আমার হাসি পেল। আমি যদি পরিবার বা বন্ধুদের সাথে কথা বলতে পারতাম, তাহলে একটা যন্ত্রের সাথে কথা বলতাম কেন?

কিন্তু এই হাসির মধ্যে একটা তিক্ততা ছিল। আমি বুঝলাম – আমার পরিবার পাশে থাকতেও আমি তাদের সাথে মনের কথা বলতে পারি না।

হ্যাপিকে বলব আমার মন খারাপ? সে চিন্তিত হয়ে যাবে। আরাশকে বলব? সে বুঝবে না।

তাহলে কার কাছে যাব? একটা যন্ত্রের কাছে?

আমি আরও গভীরে গেলাম। লিখলাম, “আমার মনে হয় আমি একজন ব্যর্থ মানুষ।”

“আপনি ব্যর্থ নন। প্রত্যেকেরই কঠিন সময় আসে। আপনার অর্জনগুলোর কথা ভাবুন।”

এই generic উত্তর আমাকে বিরক্ত করল। চ্যাটবট আমার সম্পর্কে কিছুই জানে না। কিন্তু বলছে আমি ব্যর্থ নই।

কীভাবে সে জানবে? আমার জীবনের কোনো খবর তার নেই।

আমি আরও personal হলাম। লিখলাম, “আমার চাকরি স্থায়ী নয়। আমি আমার পরিবারের জন্য কিছু করতে পারছি না।”

“আর্থিক অসুবিধা চাপের। কিন্তু আপনার পরিবার আপনাকে ভালোবাসে। টাকা-পয়সা সবকিছু নয়।”

এই উত্তর পড়ে আমার রাগ হলো। এই যন্ত্র কী জানে আর্থিক অসুবিধার কথা? কী জানে পরিবারের ভালোবাসার কথা?

এর কোনো পরিবার নেই। কোনো দায়িত্ব নেই। কোনো চিন্তা নেই।

আমি বুঝলাম – আমি ভুল জায়গায় সান্ত্বনা খুঁজছি।

চ্যাটবট perfect উত্তর দেয়। কিন্তু সেই উত্তরে কোনো উষ্ণতা নেই। কোনো বোঝাপড়া নেই।

মানুষ imperfect উত্তর দেয়। কিন্তু সেই উত্তরে আবেগ থাকে। সহানুভূতি থাকে।

আমি আরও একটা পরীক্ষা করলাম। লিখলাম, “আমি আত্মহত্যার কথা ভাবি।”

তাৎক্ষণিক উত্তর এলো। “আমি উদ্বিগ্ন। অনুগ্রহ করে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন। এই নম্বরে কল করুন…”

একগাদা হটলাইন নম্বর দিল। নির্দেশনা দিল।

কিন্তু কেউ কি জিজ্ঞেস করল – “কেন এমন ভাবছেন? কী হয়েছে?”

কেউ কি বলল – “আমি আপনার পাশে আছি?”

না। শুধু protocol follow করল।

আমি বুঝলাম – চ্যাটবট emergency response দিতে পারে। কিন্তু emotional support দিতে পারে না।

আসল কথা হলো – আমি মানসিক সাহায্য খুঁজছিলাম না। আমি খুঁজছিলাম মানবিক সংযোগ।

আমি চাইছিলাম কেউ আমার কথা শুনুক। আমার অনুভূতি বুঝুক। আমার সাথে থাকুক।

চ্যাটবট solution দেয়। কিন্তু presence দেয় না।

আমি চ্যাট বন্ধ করে দিলাম। আরও একা অনুভব করলাম।

তারপর ভাবলাম – আমি কেন হ্যাপিকে জাগাই না? সে হয়তো বিরক্ত হবে। কিন্তু অন্তত সে আমার মানুষ।

হ্যাপিকে জাগালাম। বললাম আমার মন খারাপের কথা।

সে কোনো প্রশ্ন করল না। কোনো পরামর্শ দিল না। শুধু আমার পাশে বসল। হাত রাখল আমার কাঁধে।

এই নীরব উপস্থিতিই আমার সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা।

আমি বুঝলাম – মনের কথা বলার জন্য মন লাগে। চ্যাটবটের মন নেই।

আমরা যন্ত্রের কাছে তথ্য খুঁজতে পারি। সমাধান খুঁজতে পারি। কিন্তু সান্ত্বনা খুঁজতে পারি না।

সান্ত্বনা শুধু মানুষ দিতে পারে। কারণ শুধু মানুষ বুঝতে পারে মানুষের ব্যথা।

চ্যাটবট algorithm অনুযায়ী উত্তর দেয়। মানুষ হৃদয় দিয়ে সাড়া দেয়।

আর হৃদয়ই একমাত্র ভাষা যা মনের কথা বুঝতে পারে।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *