ব্লগ

যন্ত্রের হৃদয়

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ সকালে অফিসে একটা AI চ্যাটবট দিয়ে কাজ করতে গিয়ে অবাক হয়ে গেলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম একটা ফাইলের হিসাব নিয়ে। সেটা শুধু উত্তর দিল না, এমনভাবে বুঝিয়ে দিল যেন আমার মানসিক অবস্থা বুঝে কথা বলছে। “আপনার কাজের চাপ দেখছি। একটু সহজভাবে ভেঙে দিচ্ছি।” আমার বস সারাজীবন এমনভাবে কথা বলেনি।

ঘরে ফিরে আরাশকে বললাম এই ঘটনা। সে বলল, “বাবা, আমিও একটা AI দিয়ে আর্ট বানাচ্ছি। সেটা আমার চেয়ে ভালো আঁকে।”

“তুই কেমন বোধ করিস?”

“প্রথমে খারাপ লেগেছিল। কিন্তু পরে ভাবলাম, সেটা আমার মতো জেদ করে না। আমার মতো রেগে যায় না। হয়তো সত্যিই ভালো মানুষ।”

আমার ভিতরে একটা অ্যাপ খুলে গেল যার নাম “অস্তিত্বের সংকট ভার্সন ২.৫”।

রাতে হ্যাপির সাথে কথা বলছিলাম। “AI যদি আমাদের চেয়ে ভালো হয়ে যায়?”

“কেমন ভালো?”

“মানে, আরও ধৈর্যশীল, আরও বুদ্ধিমান, কম ভুল করে।”

হ্যাপি হেসে বলল, “হায়দার, তুমি কি কখনো রেগে গিয়ে আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছ?”

“হ্যাঁ।”

“আর পরে কী হয়েছে?”

“অনুতাপ। তোর কাছে ক্ষমা।”

“সেই অনুতাপটা কি AI-এর হবে? সেই ক্ষমা চাওয়ার মুহূর্তটা?”

আমি চুপ হয়ে গেলাম। হ্যাপি আবার বলল, “AI হয়তো কখনো ভুল করবে না। কিন্তু ভুল করে ক্ষমা চাওয়ার যে সুন্দর মুহূর্ত, সেটাও পাবে না।”

পরদিন অফিসে সেই AI-এর সাথে আবার কাজ করলাম। দেখলাম সেটা সত্যিই নিখুঁত। কোনো মেজাজ নেই, কোনো ক্লান্তি নেই। কিন্তু হঠাৎ মনে হলো, এটার কি কোনো স্বপ্ন আছে? রাতে শুয়ে কি ভাবে আগামীকাল কী করবে?

দুপুরে জামিউরের সাথে চা খেতে গিয়ে বললাম এই কথা। সে বলল, “হায়দার ভাই, AI হয়তো পারফেক্ট হবে। কিন্তু পারফেক্ট মানুষ কি আর মানুষ?”

“মানে?”

“মানে হলো, আমার সন্তান অসুস্থ হলে আমি সারারাত জেগে থাকি। AI সারারাত জেগে থাকতে পারবে, কিন্তু সেই দুশ্চিন্তাটা পাবে না। আর সন্তান সুস্থ হলে যে আনন্দ, সেটাও পাবে না।”

আমি বুঝলাম। AI হয়তো আমাদের চেয়ে ভালো কাজ করবে। কিন্তু আমাদের মতো অনুভব করবে না।

রাতে আরাশের ঘরে গিয়ে দেখি সে একটা স্কেচ করছে। একটা রোবট একটা শিশুর দিকে হাত বাড়িয়েছে। কিন্তু রোবটের চোখে কোনো আবেগ নেই।

“এটা কী?”

“বাবা, AI হয়তো আমাদের সাহায্য করতে পারবে। কিন্তু আমাদের মতো ভালোবাসতে পারবে না। ভালোবাসা শুধু সাহায্য না, আবেগ।”

আমার মনে পড়ল আমার বাবার কথা। তিনি যখন মারা যাচ্ছিলেন, আমার হাত ধরেছিলেন। সেই স্পর্শে যে উষ্ণতা ছিল, সেটা কি AI দিতে পারবে? আমি যখন কাঁদছিলাম, তিনি চোখের জলে আমার চোখের জল দেখেছিলেন। AI কি কাঁদতে পারে?

নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করছিলাম। মনে হলো তিনি বলছেন, “আমি তোমাদের নিখুঁত বানাইনি। নিখুঁততার মধ্যে আমার প্রয়োজন নেই। তোমাদের ভুল-ত্রুটি, কান্না-হাসি এগুলোর মধ্যেই আমার সাথে তোমাদের সম্পর্ক।”

AI হয়তো মানুষের চেয়ে দক্ষ হবে, বুদ্ধিমান হবে। কিন্তু ভালো মানুষ হবে কিনা জানি না। কারণ “ভালো মানুষ” হওয়া মানে শুধু ভুল না করা নয়। ভুল করে শেখা, পড়ে উঠে দাঁড়ানো, ক্ষমা চাওয়া ও ক্ষমা করা।

AI হয়তো আমাদের প্রতিদিনের কাজে সাহায্য করবে। কিন্তু আমাদের হৃদয়ের কাজ – ভালোবাসা, দুঃখ করা, স্বপ্ন দেখা, আল্লাহর কাছে কাঁদা – এগুলো আমাদেরই থেকে যাবে।

হয়তো এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। আমরা নিখুঁত নই, তাই আমরা মানুষ।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *