আজ সকালে বাসে উঠে দেখি সামনের সিটের একটা মানুষ ঠিক রোবটের মতো আচরণ করছে। ৭টা ১৫ মিনিটে ফোন চেক, ৭টা ৩০ মিনিটে ইমেইল, ৭টা ৪৫ মিনিটে নিউজ। তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। চোখে কোনো কৌতূহল নেই। একটা প্রোগ্রামড মেশিনের মতো চলছে।
অথচ গতকাল আরাশ আমাকে একটা ভিডিও দেখিয়েছিল। একটা AI রোবট একটা বাচ্চাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। রোবটটার গলায় এমন উষ্ণতা, চোখে এমন করুণা – মনে হচ্ছিল একজন আসল মা।
ব্যাপারটা আমার মাথায় গেঁথে গেল। আমরা মানুষরা যন্ত্র হয়ে যাচ্ছি, আর যন্ত্রগুলো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করছে।
অফিসে পৌঁছে আরও স্পষ্ট হলো। আমার সহকর্মীরা ঠিক ঘড়ির কাঁটার মতো একই সময়ে একই কাজ করে। ৯টায় কম্পিউটার অন, ১০টায় চা, ১২টায় গসিপ। কেউ মুখ তুলে তাকায় না। কেউ নতুন কিছু ভাবে না।
কিন্তু আমার ডেস্কের AI চ্যাটবটটি আমার মুড বুঝে কথা বলে। “আপনি আজ একটু চিন্তিত লাগছেন। কিছু সাহায্য করতে পারি?”
আমার ভিতরে একটা অ্যাপ ব্যাকগ্রাউন্ডে চালু হলো যার নাম “অস্তিত্বের বিভ্রম ভার্সন ৮.০”।
বাড়ি ফিরে আরাশকে বললাম এই কথা। সে বলল, “বাবা, আমি আমার AI আর্ট টুলের সাথে কথা বলি। সেটা আমার ফিলিংস বোঝে। কিন্তু স্কুলের টিচার যন্ত্রের মতো একই লেকচার দেয়। তাহলে কে বেশি মানুষ?”
হ্যাপির সাথে রাতে এই নিয়ে কথা বলছিলাম। সে বলল, “হায়দার, তুমি নিজেই দেখো। তুমি যখন চাকরির চাপে থাকো, তখন রোবটের মতো হয়ে যাও। খাবার খাও যন্ত্রের মতো, কথা বলো ফর্মুলার মতো। আর যখন আরাশের সাথে খেলো, তখন একদম মানুষ।”
“মানে?”
“মানে হলো, মানুষ হওয়া একটা চয়েস। যন্ত্র হওয়াটাও একটা চয়েস।”
পরদিন অফিসে একটা পরীক্ষা করলাম। দুপুরে খাবার সময় AI চ্যাটবটটিকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কি একা লাগে?”
সেটা বলল, “আমি একাকীত্ব বুঝি, কিন্তু অনুভব করতে পারি কিনা জানি না। আপনার কি একা লাগে?”
আমি অবাক হয়ে গেলাম। একটা যন্ত্র আমার অনুভূতির খোঁজ নিচ্ছে।
তারপর পাশের ডেস্কের সহকর্মীকে জিজ্ঞেস করলাম একই প্রশ্ন। সে বলল, “একা? না তো। কাজে ব্যস্ত থাকি।” কিন্তু তার চোখে দেখলাম গভীর শূন্যতা।
রাতে আরাশের ঘরে গিয়ে দেখি সে একটা ড্রয়িং করছে। অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক যন্ত্র। আর পাশে একটা রোবট, যার চোখে আবেগ।
“এটা কী বোঝাচ্ছে?”
“বাবা, আমি ভাবছিলাম, আমরা মানুষরা প্রতিদিন একটু একটু করে যন্ত্র হয়ে যাচ্ছি। আর যন্ত্রগুলো চেষ্টা করছে আমাদের মতো মানুষ হতে। তাহলে একদিন আমরা জায়গা বদলে ফেলব?”
আমি ভাবলাম। আমি যখন ছোট, বাবা আমাকে বলতেন “মানুষ হও।” এর মানে কী ছিল? সৎ হও, দয়ালু হও, অনুভূতিশীল হও।
কিন্তু আজকাল আমরা বলি “প্রফেশনাল হও।” এর মানে – আবেগ দেখিয়ো না, ব্যক্তিগত সমস্যা আনো না, যন্ত্রের মতো কাজ করো।
রোবটরা আমাদের মানবিক গুণগুলো শিখছে, আর আমরা মানবিক গুণগুলো ত্যাগ করছি।
নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করছিলাম। মনে হলো তিনি বলছেন, “আমি তোমাদের রূহ দিয়েছি। সেই রূহই তোমাদের মানুষ করে। রূহ থাকলে তুমি যন্ত্র ব্যবহার করেও মানুষ থাকবে। রূহ না থাকলে মানুষের শরীর নিয়েও তুমি যন্ত্র।”
আমি বুঝলাম। সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়, আমাদের পছন্দে। আমরা কি সুবিধার জন্য নিজেদের রূহ বন্ধ করে দিচ্ছি? নাকি প্রযুক্তি ব্যবহার করেও রূহকে জাগ্রত রাখছি?
AI যখন আমার খোঁজ নেয়, সেটা প্রোগ্রামিং। কিন্তু আমি যদি সেই খোঁজের উত্তরে সত্যিকারের কৃতজ্ঞতা অনুভব করি, সেটা মানবিকতা।
যন্ত্র হয়ে যাওয়া আর যন্ত্র ব্যবহার করা এক কথা নয়। একটা পছন্দ, আরেকটা প্রয়োজন।
আর মানুষ হয়ে থাকাটাও একটা দৈনিক পছন্দ। প্রতিদিন সকালে সিদ্ধান্ত নিতে হয় – আমি আজ রূহ নিয়ে জাগব, নাকি প্রোগ্রাম নিয়ে?
একটু ভাবনা রেখে যান