ব্লগ

যুগান্তরের নিদ্রাভঙ্গ

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

জানালার কাঁচে মুখ লাগিয়ে বাইরে তাকালাম। কিন্তু এ কোন শহর? কোথায় গেল আমাদের পুরনো বাড়িগুলো? রাস্তায় উড়ছে এমন গাড়ি যেগুলো আমি কখনো দেখিনি।

গতকাল রাতে ঘুমিয়েছিলাম ২০২৫ সালে। আজ জেগে দেখি ২০৭৫।

পঞ্চাশ বছর ঘুমিয়েছি।

হ্যাপি কোথায়? আরাশ কোথায়? ছুটে গেলাম তাদের খুঁজতে। কিন্তু বাড়িতে অন্য মানুষ। তারা আমাকে দেখে ভয় পেয়ে বলল, “আপনি কে? এ বাড়িতে হায়দার নামে কেউ নেই।”

“আমি হায়দার। এ আমার বাড়ি।”

“পঞ্চাশ বছর আগে এখানে এক হায়দার থাকত। কিন্তু সে তো মারা গেছে।”

“মারা গেছে? আমি তো এখানেই আছি।”

তারা আমার দিকে এমনভাবে তাকাল যেন আমি ভূত।

রাস্তায় নেমে দেখি সব কিছু বদলে গেছে। মানুষের পোশাক বদলেছে। তাদের কথার ভঙ্গি বদলেছে। এমনকি তাদের চেহারার ধরনও যেন অন্যরকম।

আমি একা রয়ে গেছি পুরনো যুগের প্রতিনিধি হিসেবে।

কিন্তু এটা কি সত্যি? নাকি আমি স্বপ্ন দেখছি?

একটা পার্কে বসে ভাবতে লাগলাম। হয়তো আমি সত্যিই পঞ্চাশ বছর ঘুমিয়েছি। কিন্তু কেন?

ছোটবেলায় রূপকথায় পড়েছিলাম রাজকুমারীর গল্প যে শত বছর ঘুমিয়েছিল। তাকে জাগিয়েছিল রাজকুমারের চুম্বন।

কিন্তু আমাকে জাগাবে কে? আমার তো কোনো রাজকুমারী নেই।

নাকি আমি নিজেই নিজেকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিলাম? কারণ জেগে থাকতে পারছিলাম না।

যে জীবনে কথা বলতে পারি না, যোগাযোগ করতে পারি না, সেই জীবনে জেগে থেকে কী লাভ?

তাই হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আর ঘুমের মধ্যে যুগ কেটে গেছে।

কিন্তু এখন জেগেছি এমন এক পৃথিবীতে যেখানে আমি আরো বেশি অপরিচিত।

পার্কের বেঞ্চে একজন বৃদ্ধ বসে ছিল। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কি হায়দার নামে কাউকে চেনেন? পঞ্চাশ বছর আগে এই এলাকায় থাকত।”

সে আমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “হায়দার? আমার দাদুর নাম ছিল হায়দার। তিনি একদিন ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। আর কোনোদিন জাগেননি।”

আমার গলা শুকিয়ে গেল। “আপনার দাদু?”

“হ্যাঁ। আমি তার নাতি আরাশ।”

আমার সামনে বসে আছে আশি বছরের আরাশ। আমার সেই ছোট্ট ছেলে।

“আরাশ, আমি তোমার বাবা।”

সে হেসে বলল, “দাদু তো মারা গেছেন পঞ্চাশ বছর আগে। তুমি কে হও?”

আমি বুঝলাম, আমি এমন এক সময়ে জেগেছি যেখানে আমার অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ নেই। আমি ইতিহাস হয়ে গেছি।

কিন্তু সেই ইতিহাসও কেউ ঠিকমতো মনে রাখেনি।

আল্লাহ, এই কি আমার শাস্তি? যে জীবনে আমি কারো কাছে পৌঁছাতে পারিনি, মৃত্যুর পরেও কেউ আমাকে মনে রাখেনি?

নাকি এটা আমার মুক্তি? এখন আর কারো কাছে কিছু প্রমাণ করতে হবে না। কারো সাথে যোগাযোগ করতে হবে না।

আমি সম্পূর্ণ মুক্ত। সম্পূর্ণ একা।

কিন্তু এই মুক্তি আর একাকীত্বের মধ্যে পার্থক্য কী?

হয়তো কোনো পার্থক্য নেই।

হয়তো আমি পঞ্চাশ বছর ধরে এই স্বপ্নই দেখছি। যে আমি জেগে আছি, কিন্তু আসলে ঘুমিয়ে।

অথবা পঞ্চাশ বছর ধরে জেগে ছিলাম, কিন্তু মনে হয়েছিল ঘুমিয়ে আছি।

আসলে জাগা আর ঘুমের মধ্যে পার্থক্য কী? দুটোতেই তো আমি একা।

সূর্য ডুবে যাচ্ছে। আমি পার্কের বেঞ্চে বসে আছি। এই নতুন পৃথিবীতে আমার কোনো ঠিকানা নেই।

কিন্তু ভয় পাচ্ছি না। কারণ এই অবস্থা তো পুরনো পরিচিত।

আমি সব সময়ই গৃহহীন ছিলাম।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *