প্রতিদিন সকালে অফিসে এসে আমার টেবিলে বসি। একটা কম্পিউটার আছে, একটা ফাইলের স্তূপ আছে। আমি সেগুলো নিয়ে কাজ করি। কিন্তু আসলে কী কাজ করি সেটা জানি না। শুধু জানি কাজটা জরুরি, কারণ বস্ বলেছেন।
আমার জব টাইটেল “অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার (অপারেশনাল সাপোর্ট)”। কিন্তু কার অপারেশন? কীসের সাপোর্ট? জানি না।
প্রতিদিন আমি কিছু ফাইল খুলি। কিছু নম্বর দেখি। কিছু কাগজে সই করি। কিছু মেইল পাঠাই। কিছু ফোন রিসিভ করি। কিন্তু এগুলো কেন করি? জানি না।
আমার বস্ আমাকে বলেন, “এই কাজটা দেখো।” আমি দেখি। তারপর তিনি বলেন, “ঠিক আছে।” কিন্তু কী ঠিক আছে? আমি কী দেখেছি? জানি না।
আমার সহকর্মীরাও একই রকম কাজ করে। একজন আরেকজনকে কাগজ দেয়। কেউ কম্পিউটারে টাইপ করে। কেউ ফোনে কথা বলে। কিন্তু কেউ জানে না আসলে কী হচ্ছে।
আমরা সবাই একটা বিশাল যন্ত্রের অংশ। যন্ত্রটা চলে। আমরাও চলি। কিন্তু যন্ত্রটা কী করে? জানি না।
হ্যাপি জিজ্ঞেস করে, “তুমি অফিসে কী কাজ করো?” আমি বলি, “নানা কাজ।” কিন্তু নানা কাজ মানে কী? জানি না।
আরাশ বলে, “আব্বু, আপনার অফিস কী বানায়?” আমি বলি, “ডকুমেন্ট।” কিন্তু সেই ডকুমেন্ট দিয়ে কী হয়? জানি না।
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, “হে আল্লাহ, আমি কী কাজ করছি?” কিন্তু মনে হয় আল্লাহও জানেন না।
প্রতি মাসে আমি বেতন পাই। মানে আমার কোনো না কোনো কাজ আছে। কিন্তু সেই কাজের মূল্য কী? কার উপকার হচ্ছে? জানি না।
আমার কাজের একটা টার্গেট আছে। মাসে ১০০টা ফাইল দেখতে হবে। আমি ১০০টা ফাইল দেখি। টার্গেট পূরণ হয়। কিন্তু সেই ফাইল দেখে কী লাভ? জানি না।
আমাদের ডিপার্টমেন্টের একটা বাজেট আছে। প্রতি মাসে অনেক টাকা খরচ হয়। আমাদের বেতনে, অফিস ভাড়ায়, বিদ্যুৎ বিলে। কিন্তু এই খরচের বিনিময়ে কী পাওয়া যাচ্ছে? জানি না।
মাঝে মাঝে কোনো বড় অফিসার আসেন। আমাদের কাজ দেখেন। বলেন, “ভালো হচ্ছে।” কিন্তু কী ভালো হচ্ছে? জানি না।
আমাদের অফিসের একটা রিপোর্ট হয়। প্রতি মাসে সরকারে পাঠানো হয়। সেখানে লেখা থাকে আমরা কত কাজ করেছি। কিন্তু সেই কাজের অর্থ কী? জানি না।
কখনো কখনো ভাবি, আমার এই চাকরি যদি না থাকত? দেশের কী ক্ষতি হতো? সমাজের কী ক্ষতি হতো? উত্তর মনে হয়: কিছুই হতো না।
তাহলে আমি কেন এই কাজ করি? কারণ আমার বেতন লাগে। আরাশের স্কুলের ফি দিতে হয়। সংসার চালাতে হয়।
আমি একটা অর্থহীন কাজ করে অর্থবহ জীবন চালানোর চেষ্টা করছি।
আমার অফিসে ৫০ জন মানুষ কাজ করে। সবারই আমার মতো অবস্থা। কেউ জানে না কী কাজ করছে। কিন্তু সবাই কাজ করে যাচ্ছে।
আমরা সবাই মিলে একটা বিশাল অর্থহীন কাজের জাল বুনেছি। প্রতিদিন সেই জাল আরও বড় হচ্ছে।
রাতে ঘুমানোর আগে ভাবি, আগামীকাল আবার অফিসে যাব। আবার সেই একই অজানা কাজ করব।
আর এভাবেই সারাজীবন কাটিয়ে দেব। কী কাজ করছি না জেনেই।
হয়তো এটাই আধুনিক জীবনের নিয়ম। অর্থহীন কাজ করে অর্থের জন্য বেঁচে থাকা।
একটু ভাবনা রেখে যান