ব্লগ

কাজের নেশায়

নভেম্বর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া
শেয়ার

গতকাল সাইফুল একটা ছোট প্রোজেক্ট দিয়েছে। একটা ওয়েবসাইটের কন্টেন্ট লিখতে হবে। পয়সা খুব একটা নেই, কিন্তু আমি রাজি হয়ে গেলাম। কারণ এই কাজটা আমার ভালো লাগে।

সকাল নয়টায় বসেছিলাম। ভাবলাম দুপুরে শেষ করবো। কিন্তু যখন মন দিয়ে লিখতে শুরু করলাম, তখন বুঝতেই পারলাম না সময় কীভাবে কেটে যাচ্ছে।

প্রথমে একটা প্যারাগ্রাফ লিখলাম। তারপর আরেকটা। প্রতিটা বাক্য সাজাতে গিয়ে মনে হল—আমি একটা ছবি আঁকছি। শব্দ দিয়ে ছবি।

হ্যাপি এসে চা দিয়ে গেল। আমি খেয়াল করলাম না। আরাশ এসে কিছু বলল। আমি মাথা নাড়লাম, কিন্তু শুনিনি কী বলেছে। আমি সম্পূর্ণ ডুবে গেছি।

এই যে ডুবে যাওয়া—এটা কী? আমি কোথায় ডুবেছি? কাজে? নাকি নিজের ভেতরে? হয়তো দুটোই। কাজটা করতে গিয়ে আমি আমার সবচেয়ে ভালো দিকটা বের করেছি।

লিখতে লিখতে মনে হল—এই কাজটা আমার জন্য। আমার মতো করে তৈরি। যেমন একটা চাবি একটা নির্দিষ্ট তালার জন্য তৈরি। আমি এই লেখার তালা, আর এই কাজ আমার চাবি।

দুপুর হয়ে গেল। হ্যাপি খেতে ডাকল। আমি বললাম, “একটু পরে।” কিন্তু সেই পরে আর এলো না। আমি লিখে চলেছি। একটার পর একটা পাতা।

যখন কোনো একটা বাক্য ঠিক হয়ে যাচ্ছে, তখন মনে হচ্ছে—আমি একটা ধাঁধার সমাধান করেছি। যখন একটা প্যারাগ্রাফ পূর্ণ হচ্ছে, তখন মনে হচ্ছে—আমি একটা ছোট্ট বিজয় পেয়েছি।

এই বিজয়ের অনুভূতি অন্যরকম। এটা চাকরি পাওয়ার বিজয় নয়। টাকা পাওয়ার বিজয় নয়। এটা নিজেকে প্রকাশ করার বিজয়। নিজের ভেতরের সেরা জিনিসটা বের করার বিজয়।

বিকাল হয়ে গেল। আমি এখনো লিখছি। হাত ব্যথা করছে, কিন্তু মন চাইছে না থামতে। যেন একটা নেশা ধরেছে।

আরাশ এসে বলল, “বাবা, তুমি সারাদিন কী করছো?” আমি বললাম, “কাজ করছি।” “কেমন কাজ?” “যেটা আমার পছন্দ।”

আরাশ একটু দেখল। তারপর বলল, “তোমার মুখ আলাদা লাগছে।” “কেমন আলাদা?” “খুশি খুশি।” আমি হেসে বললাম, “হয়তো কাজ করতে করতে খুশি হয়ে গেছি।”

সত্যিই খুশি লাগছে। যে কাজ করতে ভালো লাগে, সেই কাজ করার সময় একটা আলাদা আনন্দ আছে। সেটা টাকার চেয়ে বড়। প্রশংসার চেয়ে বড়।

সন্ধ্যা হয়ে গেল। আমি কাজ শেষ করলাম। পড়ে দেখলাম—আমি যা লিখেছি, সেটা আমার প্রত্যাশার চেয়ে ভালো হয়েছে। আমি নিজেই অবাক হলাম।

হ্যাপি এসে বলল, “সারাদিন কিছু খাওনি।” আমি বললাম, “খিদে পায়নি।” “কেন?” “কাজে মন দিয়েছিলাম।”

আমি সত্যি কথাই বললাম। যখন মন দিয়ে পছন্দের কাজ করি, তখন আর কিছুর খেয়াল থাকে না। ক্ষুধা-তৃষ্ণা, ক্লান্তি—সব ভুলে যাই।

রাতে খেতে বসে ভাবলাম—আজ আমি কী করেছি? শুধু কিছু লিখেছি। কিন্তু এই লেখার মধ্যে আমি নিজেকে খুঁজে পেয়েছি। আমার ভেতরের যে অংশটা সবচেয়ে ভালো, সেটা বের করেছি।

আমার মনে পড়ল ছোটবেলার কথা। স্কুলে রচনা লিখতাম। টিচার পড়ে বলতেন, “ভালো হয়েছে।” সেই প্রশংসায় যে আনন্দ পেতাম, আজ সেই একই আনন্দ।

কিন্তু এখন প্রশংসার জন্য লিখি না। লিখি নিজের সন্তুষ্টির জন্য। এই সন্তুষ্টি অন্যরকম। এতে কোনো লোভ নেই। আছে শুধু ভালো লাগা।

হ্যাপি বলল, “তুমি লিখতে ভালোবাসো?” আমি বললাম, “হ্যাঁ। কিন্তু এতদিন বুঝিনি।” “এখন বুঝেছো কেন?” “কারণ আজ নিজেকে ভুলে গিয়ে লিখেছি।”

আমি সত্যিই নিজেকে ভুলে গিয়েছিলাম। হায়দার যার চাকরি নেই, যার টাকা নেই—সেই হায়দার আজ ছিল না। ছিল শুধু একজন লেখক। যে লিখতে ভালোবাসে।

আরাশ বলল, “বাবা, তুমি কি রাইটার হবে?” আমি হেসে বললাম, “জানি না। তবে লিখতে ভালো লাগে।” “তাহলে লিখো।” “হ্যাঁ, লিখবো।”

আমি ঠিক করলাম—প্রতিদিন লিখবো। হয়তো কেউ পড়বে না। হয়তো টাকা আসবে না। কিন্তু লিখবো। কারণ লেখার সময় আমি সবচেয়ে ভালো মানুষ হয়ে উঠি।

শুয়ে শুয়ে ভাবলাম—মানুষের কাছে কি এরকম একটা কাজ থাকে? যেটা করতে সে সময় ভুলে যায়? যেটা করার সময় সে নিজের সেরা রূপে থাকে?

হয়তো সবার আছে। কারো রান্নায়। কারো গানে। কারো ছবি আঁকায়। কারো মাটি নিয়ে খেলায়। সমস্যা হলো—আমরা সেই কাজটা খুঁজে পাই না। অথবা পেলেও গুরুত্ব দিই না।

আমি আজ আমার কাজটা খুঁজে পেয়েছি। আর এই খুঁজে পাওয়াটাই হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া।

কারণ যে কাজ করতে ভালো লাগে, সেই কাজই আমাদের আসল পরিচয়।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *