ছাদে একটা দাগ। পানি চুইয়ে পড়েছিল। থেকে গেছে।
শুয়ে শুয়ে দেখছি। ফজরের আজান শেষ হয়ে গেছে।
স্ত্রী নড়ল। ঘুমাওনি?
চুপ।
সারারাত জেগে ছিলে?
হুঁ।
উঠে চলে গেল।
দাগটা দেখতে লাগলাম। এই দাগ কি সারাজীবন থাকবে?
হয়তো। হয়তো না।
এইচআর অফিসে ডেকেছিল।
ঘরে ঢুকতেই গন্ধ। এয়ার ফ্রেশনার। লেবু। কৃত্রিম।
বসেন।
বসলাম।
দেখেন, কোম্পানি কিছু পরিবর্তন…
বাকি কথা মনে নেই। শুধু কয়েকটা শব্দ। ডাউনসাইজিং। রিস্ট্রাকচারিং। দুঃখিত।
লোকটার টাই নীল। হাতে কলম ঘোরাচ্ছিল। ঘোরাতে ঘোরাতে বলছিল দুঃখিত।
সাইন করেন।
করলাম।
বের হয়ে দেখলাম গেটে তিনজন। একজন সিগারেট টানছে। একজন ফোনে কথা বলছে। গলা কাঁপছে।
কারো দিকে তাকাইনি। হেঁটে গেলাম।
টাকা ফুরোল।
স্ত্রীর গয়না বেচলাম। সোনার চেইন। বিয়েতে পাওয়া।
দোকানদার ওজন করল। তেরো গ্রাম।
স্ত্রী জানালার দিকে তাকিয়ে ছিল।
বাইরে একটা কাক বসেছিল। উড়ে গেল।
ছেলে স্কুল থেকে ফিরেছে। আব্বু, তুমি কেন চাকরি করো না?
হাত থেমে গেল।
কে বলল?
বন্ধু। বলল তোর আব্বু বেকার।
স্ত্রী বলল, চুপ করো।
কিন্তু সত্যি তো?
উঠে দাঁড়ালাম। প্লেট ফেলে বারান্দায় গেলাম।
চায়ের দোকানে বসেছি।
পাশে দুইজন ফিসফিস করছে।
এই লোকটার চাকরি গেছে।
কেন?
শুনলাম ঝামেলা হয়েছিল।
কী ঝামেলা?
ঠিক জানি না। এমনি এমনি তো যায় না।
হাত কাঁপছে। কাপ রাখলাম। উঠে দাঁড়ালাম। টাকা রেখে চলে গেলাম।
পেছন থেকে শুনলাম, দেখলি? জিজ্ঞেস করলেই পালায়।
বন্ধু বলল, একটা কথা বলি। মনে করিস না।
বল।
লোকে বলছে তুই নাকি ফ্যাক্টরি থেকে টাকা মেরেছিলি।
থমকে গেলাম।
কে বলছে?
পাড়ায় শুনলাম।
আমি টাকা মারিনি।
আমি জানি।
তাহলে?
চুপ।
উঠে দাঁড়ালাম।
স্ত্রীকে বললাম। লোকে বলছে আমি চুরি করেছি।
স্ত্রী ভাত বাড়ছিল। হাত থেমে গেল।
কে বলছে?
সবাই।
চুপ।
তুমি কিছু বলছ না কেন?
কী বলব?
বলো এটা মিথ্যা।
তাকাল।
তুমি কি বিশ্বাস করো আমি চুরি করেছি?
না।
তাহলে ওই চোখে তাকাচ্ছ কেন?
মুখ নিচু করল।
উঠে চলে গেলাম।
ছেলের স্কুল থেকে ফোন। মারামারি করেছে।
প্রিন্সিপালের ঘরে। ছেলে একপাশে। মুখ ফোলা।
কেন মারলি?
ছেলে তাকাল। চোখে পানি।
ও বলল আমার আব্বু চোর।
ঘর চুপ।
দাঁড়িয়ে আছি। পা কাঁপছে।
রিকশায় ফিরছি।
ছেলে জিজ্ঞেস করল, আব্বু। তুমি চোর না, তাই না?
না।
তাহলে সবাই কেন বলে?
জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলাম।
উত্তর দিলাম না।
রাত। বারান্দায়।
পাঁচতলা থেকে নিচে তাকাচ্ছি। রাস্তা খালি। একটা কুকুর হাঁটছে।
রেলিং ধরে আছি। লোহা ঠান্ডা।
নিচে অনেক নিচে।
পেছন থেকে আওয়াজ। আব্বু?
ঘুরলাম। ছেলে দাঁড়িয়ে।
তুমি এখানে কেন?
ঘুম আসছে না।
কাছে এল। হাত ধরল।
তুমি কি কাঁদছ?
গাল ছুঁয়ে দেখলাম। ভেজা।
না।
তাহলে চোখ ভেজা কেন?
চুপ।
আব্বু, ভেতরে চলো। ঠান্ডা।
রেলিং ছেড়ে দিলাম।
রাতে স্ত্রী জিজ্ঞেস করল, আর কতদিন এভাবে?
কোনভাবে?
এভাবে। কিছু না বলে। কিছু না করে।
চুপ।
তুমি কি আমাকে ছেড়ে দিতে চাও?
স্ত্রী তাকাল। কী বলছ?
বলছি আমাকে ছেড়ে দাও। ছেলেকে নিয়ে চলে যাও। আমি…
তুমি কী?
চুপ।
স্ত্রী উঠে দাঁড়াল। রান্নাঘরে চলে গেল।
থালা ধোয়ার শব্দ। জোরে জোরে। রাগ করে।
বসে রইলাম।
পরদিন ছেলেকে নিয়ে বের হলাম।
বাসে।
কোথায় যাচ্ছি আব্বু?
জানি না।
ছেলে জানালার পাশে বসেছে। সব কিছুতে অবাক হচ্ছে।
আমি তাকিয়ে আছি।
পার্কে একটা বেঞ্চে বসলাম।
ছেলে জিজ্ঞেস করল, চাকরি না পেলে কী হবে?
জানি না।
আমরা কি গরিব হয়ে যাব?
হয়তো।
গরিব হলে খারাপ?
তাকালাম। তুই কী মনে করিস?
ছেলে ভাবল। জানি না।
চুপ করে বসে রইলাম।
সামনে পানি। একটা নৌকা যাচ্ছে। ধীরে ধীরে।
রাতে বিছানায়। ছাদের দিকে তাকিয়ে আছি।
সেই দাগ। বর্ষায় পানি পড়েছিল। থেকে গেছে।
দাগ কি যায়?
কিছু যায়। কিছু যায় না।
পরদিন সকাল। ছেলে জিজ্ঞেস করল, আব্বু, কাল কী করবে?
জানি না।
পরশু?
জানি না।
কাকটা কোথায় যাবে?
জানি না।
কেউ কি জানে?
তাকালাম ছেলের দিকে।
না। কেউ জানে না।
কাকটা উড়ে গেল।
জানালার কাছে দাঁড়িয়ে রইলাম।
রোদ পড়ছে মুখে। গরম।
কাল কী হবে জানি না।
কিন্তু এই গল্পের আসল সত্যটা কী?
সত্য হলো—চাকরি গেলে তুমি শুধু চাকরি হারাও না।
তুমি হারাও তোমার পরিচয়।
লোকে আর জানে না তুমি কে।
তুমি কী করতে? কোথায় কাজ করতে?
এগুলো ছাড়া তুমি কে?
কেউ না।
তুমি একটা শূন্য জায়গা। যেখানে লোকে তাদের সন্দেহ ভরে দেয়।
চুরি করেছে। ঝামেলা করেছে। নিশ্চয়ই কিছু একটা করেছে।
কারণ এমনি এমনি তো চাকরি যায় না।
এই বিশ্বাস। এই ধারণা।
যে যার চাকরি গেছে, সে অপরাধী।
কারণ আমাদের সমাজে চাকরি শুধু চাকরি না।
চাকরি হলো তোমার মূল্য। তোমার সম্মান। তোমার অস্তিত্ব।
চাকরি গেলে?
তুমিও গেলে।
তুমি আর মানুষ না। তুমি একটা সমস্যা।
লোকে তাকায়। ফিসফিস করে। দূরে থাকে।
কারণ ব্যর্থতা সংক্রামক। লাগতে পারে।
আর সবচেয়ে ভয়ংকর কী?
তোমার ছেলে স্কুলে মার খায়। কারণ তার বাবা বেকার।
তোমার স্ত্রী চুপ করে থাকে। কারণ কী বলবে?
তুমি নিজেই বিশ্বাস করতে শুরু করো—হয়তো আমার দোষ ছিল।
এটাই সবচেয়ে নিষ্ঠুর।
সমাজ তোমাকে এতটা ভেঙে দেয় যে তুমি নিজেই নিজেকে দোষী মনে করো।
আর তারপর?
তারপর রাতে বারান্দায় দাঁড়াও। রেলিং ধরো। নিচে তাকাও।
অনেক নিচে।
ভাবো—এখানে শেষ করে দিলে কেমন হয়?
কিন্তু তখন ছেলে আসে। হাত ধরে। বলে—ভেতরে চলো।
আর তুমি?
তুমি রেলিং ছেড়ে দাও।
কারণ তুমি জানো।
তুমি মরতে পারো। কিন্তু ছেলে বাঁচবে।
আর সে বাঁচলে তাকেও এই একই জীবন বাঁচতে হবে।
একদিন তার চাকরিও যাবে। তারও এই লজ্জা। এই অপমান।
এই চক্র।
এটা কী ধরনের সভ্যতা?
যেখানে একজন মানুষের মূল্য তার চাকরিতে?
যেখানে চাকরি গেলে মানুষও যায়?
যেখানে একটা আট বছরের ছেলেকে স্কুলে মার খেতে হয় কারণ তার বাবার চাকরি নেই?
এটা কী ধরনের ব্যবস্থা?
যে ব্যবস্থা মানুষকে শুধু “কর্মী” হিসেবে দেখে?
কাজের যন্ত্র হিসেবে?
আর যখন সেই যন্ত্র দরকার নেই?
ফেলে দাও। ডাস্টবিনে।
আর সেই মানুষ?
সে বসে থাকে। জানালার পাশে। দেখে কাক উড়ছে।
ভাবে—আমি কে?
কারণ চাকরি ছাড়া সে জানে না সে কে।
তার সব পরিচয় ছিল চাকরিতে।
এখন কিছু নেই। শুধু একটা শূন্যতা।
আর এই শূন্যতায় লোকে ভরে দেয় তাদের গল্প।
চুরি করেছে। ঘুষ খেয়েছে। ঝামেলা করেছে।
কারণ আমরা বিশ্বাস করতে পারি না—এমনি এমনি কেউ ব্যর্থ হয়।
নিশ্চয়ই কিছু করেছে।
এই বিশ্বাস আমাদের নিরাপদ রাখে।
আমরা ভাবি—আমি ভালো কাজ করছি। তাই আমার সাথে এমন হবে না।
কিন্তু সত্য?
সত্য হলো—যে কারো সাথে যে কোনো সময় হতে পারে।
ডাউনসাইজিং। রিস্ট্রাকচারিং। কোম্পানির সিদ্ধান্ত।
তোমার হাতে কিছু নেই।
কিন্তু লোকে এটা মানবে না।
কারণ মানলে তাদের নিজেদের ভয় হবে।
তাই তারা বলে—তোমার দোষ ছিল।
আর তুমি?
তুমি বিশ্বাস করতে শুরু করো।
হ্যাঁ। আমার দোষ ছিল।
আমি যথেষ্ট ভালো ছিলাম না।
আমি যথেষ্ট কঠোর পরিশ্রম করিনি।
সব মিথ্যা। কিন্তু তুমি বিশ্বাস করো।
কারণ এই মিথ্যা একটা ব্যাখ্যা দেয়।
সত্যের কোনো ব্যাখ্যা নেই।
সত্য শুধু—এই ব্যবস্থা এমন।
এই ব্যবস্থা মানুষকে ব্যবহার করে। তারপর ফেলে দেয়।
কোনো করুণা নেই। কোনো সম্মান নেই।
শুধু “দুঃখিত” শব্দটা। নীল টাই পরা একজন লোক। হাতে কলম ঘোরাচ্ছে।
আর তুমি?
তুমি সাইন করছ। কারণ আর কী করবে?
তারপর বেরিয়ে আসছ। গেটে আরও তিনজন দাঁড়িয়ে।
তারাও একই। তারাও ফেলে দেওয়া।
কিন্তু কেউ কারো সাথে কথা বলছে না।
কারণ লজ্জা। লজ্জা শেয়ার করা যায় না।
তাই একা একা হেঁটে যাচ্ছ।
আর সেই দাগ?
ছাদের সেই দাগ?
সেটা তোমার জীবনের দাগ।
পানি চুইয়ে পড়েছিল। থেকে গেছে।
যতই মুছো, যায় না।
এই দাগ তোমার সাথে থাকবে।
চাকরি ফিরলেও থাকবে।
কারণ এই দাগ এখন তোমার পরিচয়।
“যার চাকরি গিয়েছিল।”
সারাজীবন এই পরিচয়।
এটাই শেষ সত্য।
এই সভ্যতায় ব্যর্থতার কোনো মুক্তি নেই।
তুমি চিরকাল সেই মানুষ যার চাকরি গিয়েছিল।
সেই মানুষ যাকে নিয়ে লোকে ফিসফিস করেছিল।
সেই মানুষ যার ছেলে স্কুলে মার খেয়েছিল।
এই দাগ যাবে না।
কখনো যাবে না।
একটু ভাবনা রেখে যান