রমজান মাসে আমার ফেসবুক ফিডে একটার পর একটা দান কালেকশনের পোস্ট আসে। “এতিম শিশুদের ইফতার”, “বন্যার্ত মানুষের সেবা”, “গরিব পরিবারের ঈদের কাপড়”। প্রতিটা পোস্টে একই জিনিস – “আপনার প্রতিটি টাকা আল্লাহর কাছে আমানত।”
আমি একটা সংস্থায় ১০০০ টাকা দান করি। তিন মাস পর দেখি তাদের অফিসারের ফেসবুকে নতুন গাড়ির ছবি। ক্যাপশনে লেখা – “আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর বরকত।”
আমার পেটে মোচড় দেয়।
হ্যাপি বলে, “তুমি এত চিন্তা কেন করো? হয়তো তার নিজের টাকা।” আমি বলি, “আমি সেই সংস্থার অডিট রিপোর্ট দেখেছি। তারা বলেছে ৯০% টাকা প্রোগ্রামে খরচ। ১০% অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কস্ট।” হ্যাপি বলে, “তাহলে?”
আমি বলি, “তাহলে অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কস্ট দিয়ে গাড়ি কেনা যায়?”
আরাশ এসে বলে, “আব্বু, আমাদের স্কুলের পাশের দাতব্য প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা চাচার ছেলে আমেরিকায় পড়তে গেছে।” আমি জিজ্ঞেস করি, “কোথা থেকে টাকা?” আরাশ বলে, “জানি না। কিন্তু ওই চাচা বলেছিলেন তার সংস্থা গরিব মানুষের জন্য কাজ করে।”
আমি ইউটিউবে “দাতব্য প্রতিষ্ঠান কেলেঙ্কারি” লিখে সার্চ করি। হাজারো রেজাল্ট। এক এক করে দেখি। একটা প্রতিষ্ঠান বন্যার টাকা দিয়ে ডিরেক্টরের বাড়ি বানিয়েছে। আরেকটা এতিমখানার টাকা দিয়ে ব্যবসা করেছে।
আমার গলায় কান্না চেপে আসে।
আমি একটা হিসাব করি। গত বছর আমি মোট ৫০০০ টাকা দান করেছি। আমার তখনকার মাসিক আয় ১৫০০০ টাকা। মানে আমার আয়ের এক-তৃতীয়াংশ। আমাদের সারা মাসের গোশতের খরচ ছিল ১৫০০ টাকা। আমি গোশত কম খেয়ে দান করেছি।
কিন্তু সেই টাকা দিয়ে কেউ গাড়ি কিনেছে?
হ্যাপি বলে, “তুমি কি নিশ্চিত এগুলো সব জালিয়াতি?” আমি বলি, “সব নয়। কিন্তু যথেষ্ট।” আমি তাকে একটা রিপোর্ট দেখাই। “দেখো, এই সংস্থা বলেছিল তারা ১০০টা টিউবওয়েল বসাবে। কিন্তু গিয়ে দেখা গেছে ১৫টা।”
হ্যাপি বলে, “বাকি টাকা?”
আমি বলি, “উবে গেছে।”
আমি আমাদের এলাকার একটা মসজিদের ট্রেজারারের সাথে কথা বলি। তিনি বলেন, “হায়দার ভাই, আপনি জানেন, রমজানে আমরা ১০ লক্ষ টাকা কালেকশন করেছি।” আমি খুশি হয়ে বলি, “বাহ! কত মানুষের উপকার হবে।” তিনি বলেন, “হ্যাঁ। তবে ৩ লক্ষ টাকা তো আমাদের ‘প্রশাসনিক খরচ’ এ যাবে।”
আমি জিজ্ঞেস করি, “প্রশাসনিক খরচ মানে?”
তিনি একটু ইতস্তত করে বলেন, “অফিস ভাড়া, কর্মীদের বেতন, গাড়ির খরচ…”
আমি আরো জিজ্ঞেস করি, “গাড়ি কোনটা?” তিনি বলেন, “আমাদের নতুন প্রাডো।”
আমার মাথায় বজ্রপাত হয়।
রাতে আমি কোরআন পড়ি। দেখি আল্লাহ বলেছেন – “যারা অনাথদের সম্পদ খায় তারা নিজেদের পেটে আগুন ভরে।” আমি ভাবি – যারা দানের টাকা নিজের কাজে লাগায় তাদের কী হবে?
আরাশ এসে বলে, “আব্বু, আজ টিভিতে দেখলাম একটা বিজ্ঞাপন। ‘মাত্র ১০০ টাকায় একটি এতিমের এক মাসের খাবার।’ এটা কি সত্যি?” আমি বলি, “হতে পারে। কিন্তু তোমার ১০০ টাকা সত্যিই এতিমের কাছে পৌঁছায় কিনা সেটাই বড় প্রশ্ন।”
আমি একটা এক্সপেরিমেন্ট করি। একটা ছোট সংস্থায় ১০০০ টাকা দিয়ে বলি নির্দিষ্ট একটা পরিবারের জন্য। ছয় মাস পর সেই পরিবারের খোঁজ নিতে যাই। তারা বলে কিছুই পায়নি।
আমি সংস্থার সাথে যোগাযোগ করি। তারা বলে, “স্যার, সেই পরিবার পরে আর যোগ্য ছিল না। আমরা অন্য পরিবারকে দিয়েছি।” আমি বলি, “কোন পরিবারকে?” তারা নাম বলতে পারে না।
আমার মনে হয় আমি একটা ব্ল্যাক হোলে টাকা ফেলছি।
আমি ডিরেক্ট দান দেয়ার চেষ্টা করি। আমাদের বিল্ডিংয়ের কাজের লোক রহিমকে সরাসরি ১০০০ টাকা দিই তার মেয়ের স্কুল ফি এর জন্য। দুই সপ্তাহ পর তার মেয়ে স্কুলে ভর্তি হয়েছে দেখি।
আমি ভাবি – এইভাবে দান দেয়া কি ভালো? কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে না দিয়ে?
হ্যাপি বলে, “তুমি যদি নিশ্চিত না হও, তাহলে দান করো না।” আমি বলি, “কিন্তু দান তো আল্লাহর হুকুম। আমি কিভাবে বন্ধ করবো?”
হ্যাপি বলে, “তাহলে যাচাই করে দাও।”
আমি একটা স্প্রেডশিট বানাই। যেসব প্রতিষ্ঠানে দান দিতে চাই তাদের লিস্ট। তাদের অডিট রিপোর্ট চাই। তাদের প্রোজেক্ট ভিজিট করি। তাদের সুবিধাভোগীদের সাথে কথা বলি।
অবাক হয়ে দেখি ১০টার মধ্যে ৭টাই ফেইক বা অসৎ।
আমি প্রশ্ন করি নিজেকে – আল্লাহর নাম করে প্রতারণা কি সবচেয়ে বড় গুনাহ না?
রাতে স্বপ্ন দেখি। কেয়ামতের দিন। আমার দেয়া দানের টাকাগুলো সাক্ষী দিচ্ছে। বলছে, “এই টাকা দিয়ে গাড়ি কেনা হয়েছে।” “এই টাকা দিয়ে বিদেশ ট্যুর হয়েছে।” “এই টাকা দিয়ে ব্যবসা করা হয়েছে।”
আমি কোনো জবাব দিতে পারি না।
সকালে ঘুম ভেঙে আয়নায় মুখ দেখি। ভাবি – আমি কি দান দেয়ার আগে আল্লাহর কাছে দুআ করেছি যেন এই টাকা সঠিক জায়গায় পৌঁছায়?
নাকি আমি শুধু নিজের বিবেকের শান্তির জন্য দান দিয়েছি?
একটু ভাবনা রেখে যান