আজ সকালে আরাশ জিজ্ঞেস করল, “বাবা, আমি কেন এই পৃথিবীতে এসেছি?” আমি থতমত খেয়ে গেলাম। এগারো বছরের ছেলের মুখে এমন প্রশ্ন?
“কেন এমন প্রশ্ন?” আমি পাল্টা জিজ্ঞেস করলাম।
“স্কুলে টিচার বলেছেন—সবার জীবনের একটা উদ্দেশ্য আছে। আমার উদ্দেশ্য কী?”
আমি চুপ হয়ে গেলাম। আরাশ যে প্রশ্ন করেছে, সেটা আমি নিজেও প্রতিদিন করি। আমার জীবনের উদ্দেশ্য কী? এই উদ্দেশ্য কে ঠিক করেছে? আমি? নাকি কেউ আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছে?
“তুমি কী মনে করো?” আমি আরাশকে জিজ্ঞেস করলাম।
“জানি না। কিন্তু মনে হয় আমি নিজেই ঠিক করবো।”
আরাশের এই সহজ উত্তর শুনে আমি অবাক হলাম। সে কি আমার চেয়ে বেশি জানে?
সারাদিন এই প্রশ্নটা আমার মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল। আমার জীবনের উদ্দেশ্য কী? আমি কি হায়দার হওয়ার জন্য জন্মেছি? নাকি জন্মের পর আমি হায়দার হয়েছি?
আমি যখন জন্মেছিলাম, তখন কি আল্লাহ্ ঠিক করে রেখেছিলেন যে আমি চট্টগ্রামে জন্মাবো? এই পরিবারে? এই মা-বাবার ছেলে হবো? হ্যাপিকে বিয়ে করবো? আরাশের বাবা হবো?
নাকি এসব আমার নিজের পছন্দ?
কিন্তু আমি তো চট্টগ্রামে জন্মানোর জন্য পছন্দ করিনি। আমি তো এই পরিবারে জন্মানোর জন্য আবেদন করিনি। তাহলে এগুলো পূর্বনির্ধারিত।
কিন্তু হ্যাপিকে ভালোবাসাটা? সেটা কি আমার পছন্দ? নাকি সেটাও ঠিক হয়ে ছিল?
আমি ভাবলাম—যদি আমি অন্য কলেজে পড়তাম, তাহলে কি হ্যাপির সাথে দেখা হতো? হয়তো হতো না। তাহলে আমি অন্য কাউকে ভালোবাসতাম। তাহলে ভালোবাসাটা কি পরিস্থিতির ব্যাপার?
সন্ধ্যায় হ্যাপিকে এই প্রশ্ন করলাম। “তুমি কি মনে করো আমাদের দেখা হওয়াটা পূর্বনির্ধারিত ছিল?”
হ্যাপি হেসে বলল, “জানি না। তবে আমি খুশি যে হয়েছে।”
“কিন্তু যদি না হতো?”
“তাহলে হয়তো অন্য কাউকে ভালোবাসতাম। কিন্তু সেটা এখন গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো—আমি তোমাকে বেছে নিয়েছি।”
হ্যাপির কথায় আমি একটা সূত্র পেলাম। হয়তো জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন এভাবে করা ঠিক নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমি কী বেছে নিচ্ছি?
আমি কি পূর্বনির্ধারিত পথে হাঁটছি? নাকি প্রতিদিন নতুন পথ তৈরি করছি?
আমার মনে পড়ল—আমি যখন বেকার হই, তখন হতাশ হয়ে বসে থাকতে পারতাম। কিন্তু আমি চেষ্টা করেছি। নতুন চাকরি খুঁজেছি। এটা কি আমার পছন্দ?
আমি যখন আরাশের জন্য লেখালেখি শুরু করেছি, সেটা কি পূর্বনির্ধারিত ছিল? নাকি আমি নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি?
রাতে শুয়ে ভাবলাম—হয়তো জীবনটা একটা মিশ্রণ। কিছু জিনিস আগে থেকেই ঠিক করা। যেমন আমার জন্মের জায়গা, পরিবার, শারীরিক গঠন। কিন্তু এসবের মধ্যে আমি কী করবো, সেটা আমার হাতে।
আমি জন্মেছি এই পরিবারে—এটা আমার পছন্দ ছিল না। কিন্তু এই পরিবারে কেমন ছেলে হবো, সেটা আমার পছন্দ।
আমার শরীর চিকন—এটা আমি ঠিক করিনি। কিন্তু এই শরীর নিয়ে কী করবো, সেটা আমার হাতে। জিমে গিয়ে শক্তিশালী করতে পারি। নাকি দুর্বল রেখে দিতে পারি।
আরাশ আমার ছেলে—এটা হয়তো নিয়তি। কিন্তু তার কেমন বাবা হবো, সেটা আমার পছন্দ।
আমি বুঝলাম—জীবনের উদ্দেশ্য হয়তো একটা কো-অপারেশন। আল্লাহ্ (বা নিয়তি, বা প্রকৃতি) একটা কাঠামো দিয়েছেন। আর আমি সেই কাঠামোর মধ্যে ছবি আঁকি।
কাঠামো আমার না। কিন্তু ছবিটা আমার।
আমার জন্ম চট্টগ্রামে—এটা কাঠামো। কিন্তু চট্টগ্রামে কেমন মানুষ হবো, সেটা আমার ছবি।
আমার একটা মন আছে যেটা প্রশ্ন করে—এটা কাঠামো। কিন্তু কী প্রশ্ন করবো, কীভাবে উত্তর খুঁজবো, সেটা আমার ছবি।
পরদিন সকালে আরাশ আবার জিজ্ঞেস করল, “বাবা, আমার জীবনের উদ্দেশ্য কী?”
আমি বললাম, “তোমার উদ্দেশ্য তুমি নিজেই তৈরি করবে। তবে তার জন্য কিছু উপকরণ তুমি পেয়েছো। একটা ভালো মন, একটা সুস্থ শরীর, একটা ভালো পরিবার। এই উপকরণ দিয়ে তুমি যা খুশি বানাতে পারো।”
“তাহলে আমি আমার জীবনের মালিক?”
“অর্ধেক মালিক। বাকি অর্ধেক মালিক যিনি তোমাকে এই উপকরণ দিয়েছেন।”
আরাশ খুশি হয়ে গেল। “তাহলে আমি নিজেই ঠিক করবো আমি কী হবো।”
আমি মুচকি হেসে বললাম, “হ্যাঁ। কিন্তু ভালো কিছু হওয়ার চেষ্টা করিস।”
আমার মনে হলো—এভাবেই হয়তো জীবনের উদ্দেশ্য তৈরি হয়। প্রদত্ত সম্ভাবনার মধ্যে আমাদের সচেতন পছন্দ।
আমাদের হাতে পূর্ণ স্বাধীনতা নেই। কিন্তু সম্পূর্ণ বন্দীত্বও নেই।
আর এই আংশিক স্বাধীনতাই হয়তো জীবনকে এত আকর্ষণীয় করে তোলে।
একটু ভাবনা রেখে যান