অন্ধকার ঘরে স্মার্টফোনের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা এক ব্যক্তি, যা সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যালগরিদমের বৃত্ত, ডিজিটাল কারাগার এবং আমাদের পছন্দের বিভ্রমকে তুলে ধরে।

জীবন

শিকলহীন কারাগার: স্ক্রিনের ভেতরে কে নিয়ন্ত্রণ করছে আমাদের?

সেপ্টেম্বর ২০২৫ · 11 মিনিটে পড়া
শেয়ার
অন্ধকার ঘরে স্মার্টফোনের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা এক ব্যক্তি, যা সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যালগরিদমের বৃত্ত, ডিজিটাল কারাগার এবং আমাদের পছন্দের বিভ্রমকে তুলে ধরে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা যা দেখি, তা কি সত্যিই আমাদের নিজস্ব পছন্দ নাকি স্মার্ট অ্যালগরিদমের তৈরি করা এক অদৃশ্য ডিজিটাল কারাগার?

বৃত্ত

তুমি ভাবছ তুমি বেছে নিচ্ছ। এটাই সবচেয়ে বড় মিথ্যা।


এক সেকেন্ড

সকালে একটা ভিডিও দেখতে বসো।

পাঁচ মিনিট।

ঘণ্টাখানেক পর থামো।

পনেরোটা ভিডিও দেখে ফেলেছ।

তুমি এগুলো খোঁজোনি।

একটাও না।

অ্যাপ দিয়েছে।

কেন দিয়েছে?

কারণ একবার এক সেকেন্ড থেমেছিলে একটা ভিডিওতে।

শুধু এক সেকেন্ড।

অ্যাপ দেখেছে।

এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছে — এই মানুষ এটা পছন্দ করে।

তারপর থেকে দিচ্ছে।

তুমি দেখছ।

অ্যাপ নিশ্চিত হচ্ছে।

একটা বৃত্ত।


পছন্দ মানে বাছাই

কিন্তু তুমি কি সত্যিই পছন্দ করো?

নাকি সামনে এসেছে বলে দেখছ?

পার্থক্য আছে।

পছন্দ মানে অপশন দেখা। তারপর বাছাই।

এখানে অপশন কোথায়?

তুমি দেখছ যা দেখানো হচ্ছে।

বাকি পৃথিবী কোথায়?

দেখানো হচ্ছে না।

তাই নেই।


বিরিয়ানির গল্প

একবার বিরিয়ানি খেয়েছ।

অ্যাপ দেখল।

তারপর থেকে শুধু বিরিয়ানি রেকমেন্ড করল।

তুমি বিরিয়ানিই অর্ডার করলে।

কারণ সামনে ওটাই ছিল।

এখন তুমি মনে করো — তোমার প্রিয় খাবার বিরিয়ানি।

কিন্তু হয়তো থাই খেলে আরও ভালো লাগত।

জানার উপায় নেই।

অ্যাপ কখনো দেখায়নি।

তাহলে তোমার পছন্দ তৈরি হলো কীভাবে?

তুমি বেছেছ?

নাকি অ্যাপ বেছে দিয়েছে?

এবং তুমি ভাবছ তুমি বেছেছ?


রেডিওর বাবা

একটা বাবা ছিল।

রেডিও শুনত।

একটাই চ্যানেল।

গান আসত। নাটক আসত। খবর আসত। কৃষির কথা আসত।

বাবা সব শুনত।

কেউ বলে দিত না কী শুনবে।

সে নিজে ঠিক করত।

এখন?

প্রতিটা মানুষের জন্য আলাদা পৃথিবী।

তুমি যা পছন্দ করো, শুধু তাই।

শুনতে ভালো লাগছে?

কিন্তু মানে কী এর?

মানে — তুমি যা জানো না, সেটা কখনো জানবেও না।

তোমার পৃথিবী ছোট হচ্ছে।

প্রতিদিন।


দুটো স্ক্রিন

অফিসে দুজন পাশাপাশি বসে।

একজন বলছে — ওই সিরিজটা দেখেছিস? সবাই দেখছে।

অন্যজন বলছে — না। আমাকে দেখায়নি।

একই অ্যাপ।

দুটো আলাদা পৃথিবী।

তারা পাশাপাশি বসে আছে।

কিন্তু তাদের স্ক্রিনে দুটো আলাদা সত্য।

এই দুই সত্য কোনোদিন মিলবে না।


শিকলহীন কারাগার

সবচেয়ে ভয়ানক কথা —

তুমি জানো না যে তুমি জানো না।

তুমি মনে করো তুমি সব দেখছ।

কারণ স্ক্রিনে অনেক কিছু আসছে।

কিন্তু যা আসছে না, সেটা দেখতেই পাচ্ছো না।

এটাকে কারাগার বলে।

কিন্তু এমন কারাগার যেখানে শিকল নেই।

দেয়াল দেখা যায় না।

মনে হয় তুমি মুক্ত।

হাঁটছ। দেখছ। বাছাই করছ।

কিন্তু তুমি একটা সীমানার ভেতরে।

এবং সেই সীমানা প্রতিদিন ছোট হচ্ছে।


বৃত্ত স্মার্ট

তাহলে কী করব?

বৃত্ত থেকে বেরোনো সহজ না।

বৃত্ত শেখে।

তুমি সার্চ করলে কী হয়?

সে সেটাও শেখে।

তুমি যেদিকে যাও, সে সেদিকে যায়।

একটা শিশু বলছিল —

আমি নিজে সার্চ করে দেখি। কিছুদিন পর দেখি সেগুলোও রেকমেন্ডেশনে চলে আসছে।

মনে হয় যেখানেই যাই, বৃত্তটা ধরে ফেলে।


একটাই কাজ

কিন্তু একটা জিনিস করা যায়।

জানা যায় যে বৃত্ত আছে।

এটুকুই।

সকালে ফোন খোলো।

নোটিফিকেশন — “আপনার জন্য নতুন ভিডিও।”

থামো।

ক্লিক করো না।

জিজ্ঞেস করো — আমার জন্য? নাকি তাদের জন্য যারা চায় আমি দেখি?

এই প্রশ্নটা বৃত্ত ভাঙে না।

কিন্তু একটা ফাটল তৈরি করে।


আরামদায়ক বৃত্ত

সত্যি কথা?

বেশিরভাগ মানুষ বৃত্তেই থাকবে।

কারণ বৃত্ত আরামদায়ক।

বৃত্তে ভাবতে হয় না।

বাইরে ভাবতে হয়। খুঁজতে হয়। ভুল করতে হয়।

তাই বেশিরভাগ বলবে — থাক। এতেই ভালো আছি।

হয়তো ভালোই আছে।

কিন্তু একটা প্রশ্ন থাকে।

তুমি ভালো আছ বলে মনে হচ্ছে —

কারণ তুমি সত্যিই ভালো আছ?

নাকি কারণ তোমাকে বলা হয়েছে তুমি ভালো আছ?

এবং তুমি বিশ্বাস করেছ?


রাস্তায়

রাস্তায় মানুষ হাঁটছে।

হাতে ফোন।

তারা কী দেখছে?

তারা নিজেরা ঠিক করেছে?

নাকি কেউ ঠিক করে দিয়েছে?

এবং তারা জানে না?

এই প্রশ্নের উত্তর নেই।

শুধু প্রশ্নটা থাকুক।

মাথায়।

সারাজীবন।

অনুভূতি অস্তিত্ব পরিচয় বাস্তবতা

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

ইসলাম

দর্পণ

অক্টোবর ২০২৫ · 8 মিনিটে পড়া

জীবন

সময়

অক্টোবর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *