রাস্তায় হঠাত দেখা হয়ে গেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সিনিয়র ভাইয়ের সাথে। প্রায় পাঁচ বছর পর দেখা। প্রথমেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কেমন আছো?” আর আমি অটোমেটিক উত্তর দিলাম, “ভালো আছি, আপনি কেমন আছেন?” তিনি বললেন, “ভালো।” তারপর দু’সেকেন্ড নীরবতা। এবং আমরা দুজনেই বুঝলাम যে আমাদের কথা শেষ।
এই “কেমন আছো?” প্রশ্নটা আমাদের সমাজের সবচেয়ে অর্থহীন প্রশ্ন। কেউ আসলে জানতে চায় না আমি কেমন আছি। আর আমিও আসলে বলতে চাই না আসলে কেমন আছি।
যদি আমি সত্যি বলতাম, “ভালো নেই। অফিসে অনেক চাপ। বাড়িতে টাকার সমস্যা। আরাশের পড়ালেখা নিয়ে চিন্তা।” তাহলে কী হত? লোকটা হয়তো পালিয়ে যেত।
কিন্তু আমরা সবাই জানি এই প্রশ্নের উত্তর হবে “ভালো।” অন্য কোনো উত্তর প্রত্যাশিত নয়। এটা একটা সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান।
অফিসে প্রতিদিন এই একই কথোপকথন হয়। সহকর্মীরা জিজ্ঞেস করে, “কেমন আছেন?” আমি বলি, “ভালো।” তারা বলে, “ভালো।” তারপর আমরা নিজ নিজ কাজে চলে যাই।
আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করি, “কেন আমরা এমন প্রশ্ন করি যার উত্তর আমরা শুনতে চাই না?”
একদিন পরীক্ষা করে দেখেছিলাম। এক সহকর্মী জিজ্ঞেস করল, “কেমন আছেন?” আমি বললাম, “আসলে খারাপ। মাথা ব্যথা করছে।” সে বলল, “আচ্ছা, ভালো।” এবং চলে গেল। সে আমার উত্তর শুনেইনি।
এই “কেমন আছো?” প্রশ্নের আরেকটা সমস্যা হল এর পরিবর্তে আর কিছু বলার নেই। আমাদের সামাজিক শিষ্টাচারে এর বিকল্প কোনো প্রশ্ন নেই।
পশ্চিমা দেশে তারা বলে “How’s it going?” বা “What’s up?” আমাদের এখানে সব প্রশ্নই “কেমন আছো?” তে গিয়ে ঠেকে।
আরাশ একদিন বলেছিল, “আব্বু, আপনি সবার কাছে কেন জিজ্ঞেস করেন কেমন আছে? আপনি তো জানেন তারা ‘ভালো’ বলবে।” তার এই নিষ্পাপ প্রশ্নে আমি হতবাক।
হ্যাপি বলে, “এটা শিষ্টাচার। আগ্রহ দেখানোর একটা উপায়।” কিন্তু এই আগ্রহ কি আসল? নাকি কৃত্রিم?
মাঝে মাঝে ভাবি, যদি আমরা এই প্রশ্নের বদলে অন্য কিছু জিজ্ঞেস করতাম? “আজ কী করেছেন?” বা “কী নতুন?” হয়তো তাহলে আরো সার্থক কথোপকথন হত।
কিন্তু সেসব প্রশ্নের উত্তর দিতে সময় লাগে। আর আমাদের কারো সময় নেই। তাই “কেমন আছো?” এর মতো দ্রুত শেষ হওয়া প্রশ্নই সুবিধাজনক।
একবার এক বন্ধু অসুস্থ অবস্থায় আমাকে বলেছিল, “ভালো নেই।” আমি তখন তার খবর নিয়েছিলাম। পরে সে বলেছিল যে সে অবাক হয়েছিল আমি আসলেই শুনেছি।
হয়তো সমস্যা আমাদের শোনার অভ্যাসে। আমরা প্রশ্ন করি কিন্তু উত্তর শুনি না। উত্তর আগেই ধরে নিয়ে রাখি।
বিদেশি বন্ধুরা বলে তাদের দেশে মানুষ সত্যি বলে কেমন আছে। খারাপ থাকলে বলে খারাপ। তারপর সে নিয়ে কথা হয়।
আমাদের সংস্কৃতিতে দুঃখ-কষ্টের কথা বলা লজ্জার। তাই সবাই “ভালো আছি” বলে।
কিন্তু এই “ভালো আছি” এর পেছনে হয়তো অনেক না বলা কথা লুকিয়ে থাকে। অনেক না শোনা ব্যথা।
আজকাল চেষ্টা করি একটু বেশি মনোযোগ দিয়ে শুনতে। “কেমন আছো?” প্রশ্নের উত্তরে যদি কেউ দ্বিধা করে, তাহলে আরো জিজ্ঞেস করি।
হয়তো এভাবে এই একঘেয়ে প্রশ্নটাকে একটু অর্থবহ করে তোলা যায়।
একটু ভাবনা রেখে যান