ব্লগ

খাবার ফেলার পাপবোধ

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

প্লেটে দুটো ভাতের দানা পড়ে আছে। হ্যাপি বলছে, “ফেলে দাও, এত অল্প দিয়ে কী হবে?” কিন্তু আমার হাত থেমে যায়। দুটো ভাতের দানা, এক চিমটি তরকারি। এত সামান্য যে কারো চোখেই পড়বে না। কিন্তু আমার ভিতরে একটা তীব্র যন্ত্রণা শুরু হয়ে যায়।

বাবার কণ্ঠস্বর কানে বাজে, “খাবার ফেলতে নেই। এক একটা দানায় কৃষকের ঘাম।” তখন বুঝতাম না কথাটার মানে। এখন বুঝি। কিন্তু শুধু কৃষকের ঘাম নয়, এর মধ্যে আরো কিছু আছে। একটা বিশ্বাস, একটা সংস্কার, একটা ভয়।

আমার শৈশবে খাবার মানেই ছিল পবিত্রতা। অন্নব্রহ্মা। খাবার ফেলা মানে পাপ। কিন্তু এখন? এখন আমি জানি অনেক কিছুই। জানি যে খাবার শুধু খাবারই। জানি যে দু’টি ভাতের দানা ফেললে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে না। কিন্তু তাহলে এই পেট কেন এত মোচড় দিচ্ছে?

হ্যাপি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসছে। “তুমি আবার সেই একই জিনিস নিয়ে ভাবছ, তাই না? ছোটবেলার সেই সংস্কার।” সে জানে আমার দুর্বলতা। জানে কেন আমি কখনো খাবার ফেলতে পারি না।

আরাশ এসে প্লেটের দিকে তাকিয়ে বলে, “আব্বু, এটা তো খুবই অল্প। এটা তো কিছুই না।” এগারো বছরের ছেলেটা আমার চেয়ে বেশি যুক্তিবাদী। কিন্তু আমি? আমি আটকে আছি একটা অদ্ভুত জায়গায়। যেখানে পুরনো বিশ্বাস আর নতুন যুক্তি মিলেমিশে একাকার।

মনে পড়ে যায় সেই দিনগুলোর কথা যখন আমাদের খুব কষ্ট ছিল। বাবা মারা যাওয়ার পর। তখন এক বেলা খেয়ে থাকতে হত। খাবারের প্রতিটি দানা ছিল অমূল্য। হয়তো সেই স্মৃতি আমার শরীরে গেঁথে গেছে। রক্তে মিশে গেছে।

কিন্তু আজ আমাদের অবস্থা ভালো। অন্তত খাবারের জন্য চিন্তা করতে হয় না। তাহলে এই অযৌক্তিক ভয় কেন? এই পাপবোধ কেন?

আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করি, “এই যে আমার মনের অবস্থা, এটা কি ঠিক? নাকি আমি খামোখা নিজেকে কষ্ট দিচ্ছি?” কিন্তু উত্তর আসে না। বরং মনে হয় যেন এই দ্বিধাই আমার পরিচয়।

শেষ পর্যন্ত আমি সেই দুটো ভাতের দানা মুখে দিয়ে দিই। হ্যাপি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আরাশ মাথা নাড়ে। তারা বোঝে না যে আমার কাছে এটা শুধু খাবার নয়। এটা একটা সংগ্রাম। নিজের সাথে নিজের।

রাতে শুয়ে ভাবি, এই যে আমার চরিত্রের এই দিকটা, এটা কি আমাকে দুর্বল করে তুলছে? নাকি শক্তিশালী? পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ যা পারে, সেই সাধারণ কাজটা আমি পারি না। একটু খাবার ফেলে দিতে পারি না।

কিন্তু হয়তো এটাই আমার আসল পরিচয়। হয়তো এই যে ছোট ছোট বিষয়েও আমি এত গুরুত্ব দিই, এটাই আমাকে আলাদা করে। ভালো না খারাপ, সেটা জানি না। কিন্তু এটাই আমি।

আগামীকাল আবার কোথাও না কোথাও খাবার বেঁচে যাবে। আবার সেই একই দ্বন্দ্ব। আবার সেই একই পাপবোধ। কিন্তু আমি জানি, আমি আবারো সেই খাবার ফেলতে পারব না। এটাই আমার নিয়তি। এটাই আমার চরিত্র।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *