ব্লগ

একাকী খাবারের নিরানন্দ

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ হ্যাপি ও আরাশ দুজনেই বাইরে। হ্যাপি তার বোনের বাসায়, আরাশ বন্ধুর জন্মদিনে। আমি একা ঘরে। রান্না করা খাবার রেডি, প্লেটে সাজানো। কিন্তু খেতে বসে মনে হচ্ছে খাবারগুলো যেন নিষ্প্রাণ।

একই ভাত, একই তরকারি যেটা কাল সবাই মিলে খেয়েছিলাম আর আজ খাচ্ছি একা। কিন্তু স্বাদ একদম আলাদা। কাল মনে হয়েছিল খুবই ভালো হয়েছে, আজ মনে হচ্ছে কিছু একটা যেন অভাব।

প্রথম দু’চামচ খাওয়ার পর আর এগোতে পারছি না। গলা দিয়ে নামছে না। যেন খাবারের সাথে সাথে একটা নিরানন্দও গিলতে হচ্ছে। এই কেমন অদ্ভুত অনুভূতি যার নাম আমি জানি না।

খাওয়ার সময় কেউ জিজ্ঞেস করে না “কেমন লাগছে?” কেউ বলে না “আরেকটু নাও।” শুধু আমি আর আমার প্লেটের খাবার। এই নিরবতা কেন এত ভারী লাগছে?

মনে পড়ে যায় ছোটবেলার কথা। বাবা-মা, ভাই-বোন সবাই একসাথে খেতাম। কত হৈচৈ, কত গল্প। কেউ না কেউ বলত “এটা খাও, ওটা খাও।” তখন মনে হত এগুলো সব বিরক্তিকর। এখন মনে হয় সেই বিরক্তিকর কথাগুলোই খাবারে স্বাদ এনে দিত।

আরাশের অনুপস্থিতি সবচেয়ে বেশি অনুভব করছি। সে সাধারণত খেতে খেতে এত গল্প করে যে আমাকে বলতে হয় “আগে খাওয়া শেষ কর।” আজ সেই গল্পের অভাব অনুভব করছি।

হ্যাপিও নেই যে বলবে “আরো একটু নিয়ে খাও” বা “এটা তোমার পছন্দের, নাও।” তার এই ছোট ছোট উৎসাহ দেওয়া কথাগুলো ছাড়া খাওয়াটাই অসম্পূর্ণ লাগছে।

অর্ধেক খাবার প্লেটেই রেখে দিয়ে উঠে পড়লাম। ক্ষুধা ছিল, কিন্তু রুচি ছিল না। এই পার্থক্যটা আগে কখনো এত স্পষ্টভাবে বুঝিনি।

টিভি চালিয়ে দিলাম একটা সিরিয়াল। ভাবলাম এতে হয়তো মনোযোগ ভাগ হবে, আবার খেতে পারব। কিন্তু না। একাকীত্বের যে অনুভূতি, সেটা টিভির আওয়াজেও কমল না।

আল্লাহর কাছে মনে মনে বলি, “মানুষ কি আসলেই সামাজিক প্রাণী? খাওয়া-দাওয়ার মতো মৌলিক বিষয়েও কি অন্যদের উপস্থিতি দরকার?” মনে হয় উত্তর পাচ্ছি নিজের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই।

সন্ধ্যায় হ্যাপি ফোন করে জিজ্ঞেস করল, “খেয়েছ?” আমি বললাম, “হ্যাঁ।” কিন্তু সত্যিটা বলতে পারলাম না যে খেয়েছি কিন্তু খাওয়া হয়নি।

রাতে তারা ফিরে এসে যখন রাতের খাবার খেলাম সবাই মিলে, তখন বুঝলাম আসল পার্থক্যটা কী। একই রান্না, কিন্তু স্বাদ সম্পূর্ণ ভিন্ন। হ্যাপি বলল, “তুমি বেশি খাচ্ছ মনে হচ্ছে।” আমি হাসলাম, কিন্তু বলতে পারলাম না যে দুপুরে খাওয়া হয়নি বলে।

বুঝলাম খাবার শুধু পুষ্টি নয়। খাবার একটা অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতার সবচেয়ে বড় অংশ হল সাহচর্য। মানুষের উপস্থিতি। কথাবার্তা। হাসিঠাট্টা।

হয়তো এই কারণেই একা থাকা মানুষেরা খাওয়ায় অনীহা পায়। শুধু আমি নই, অনেকেরই এমন হয়। একাকীত্ব যে শুধু মনে প্রভাব ফেলে তা নয়, শরীরেও ফেলে।

আগামীকাল যদি আবার একা থাকি, তাহলে হয়তো কারো সাথে ফোনে কথা বলতে বলতে খাব। অথবা কোনো বন্ধুকে দাওয়ত দেব। কারণ এখন বুঝেছি, খাওয়া শুধু খাওয়া নয় – এটা একটা সামাজিক অভিজ্ঞতা।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *