ব্লগ

ডায়েটের প্রতিজ্ঞা আর খাবারের প্রতিশোধ

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

“আজ থেকে ডায়েট,” আমি সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বললাম।

পেটটা একটু বেরিয়ে এসেছে। হেঁটে একটু কষ্ট হয়। এভাবে চলতে পারে না।

“আজ থেকে কম খাব। চিনি খাব না। ভাত কম খাব।”

হ্যাপিকে বললাম। “হ্যাপি, আমি ডায়েট করব। তুমি কম রান্না করবে।”

“আচ্ছা,” হ্যাপি বলল। “কিন্তু তুমি ক’দিন পারবে?”

“এইবার পারব। দেখিস।”

সকালের নাস্তায় এক টুকরো রুটি খেলাম। চিনি ছাড়া চা খেলাম। মন খুব খারাপ লাগল।

দুপুরে একটু ভাত খেলাম। মাছ খেলাম। কিন্তু মন ভরল না।

বিকেলে অফিসে বসে আছি। পাশের টেবিলে সহকর্মী বিস্কুট খাচ্ছে।

আমার মুখে পানি এসে গেল।

“শুধু একটা বিস্কুট,” আমি ভাবলাম। “একটা বিস্কুটে কিছু হয় না।”

একটা বিস্কুট নিলাম। খেলাম।

কিন্তু সেই বিস্কুটের স্বাদ অসাধারণ লাগল। যেন এতোদিন এমন মিষ্টি কিছু খাইনি।

“আরো একটা।”

আরেকটা নিলাম।

“এটাই শেষ।”

আরেকটা নিলাম।

কিছুক্ষণের মধ্যে পুরো প্যাকেট শেষ।

“আমি কী করলাম!” আমি অপরাধবোধে ভুগতে শুরু করলাম।

সন্ধ্যায় ঘরে ফিরলাম। হ্যাপি জিজ্ঞেস করল, “ডায়েট কেমন চলছে?”

“ভালো,” আমি মিথ্যা বললাম।

রাতের খাবারের সময় দেখি হ্যাপি আমার জন্য কম পরিমাণ ভাত দিয়েছে। একটু তরকারি। একটু মাছ।

খেতে খেতে মনে হলো – এতো কম খাবার দিয়ে পেট ভরবে কেন?

“হ্যাপি, আরেকটু ভাত দাও।”

“ডায়েট করছো না?”

“এটুকু খেলে তো দুর্বল হয়ে যাব।”

হ্যাপি আরেকটু ভাত দিল। তারপর আরেকটু। এভাবে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশিই খেলাম।

পরদিন সকালে আবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বললাম, “আজ থেকে সত্যিই ডায়েট।”

কিন্তু বিচিত্র ব্যাপার হলো – ডায়েট করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকে খাবারের প্রতি আগ্রহ বেড়ে গেছে।

আগে যেই বিস্কুট আমার খেতে ইচ্ছা করত না, এখন সেইটাই খুব লোভনীয় লাগে।

আগে যেই মিষ্টির দোকান পাশ দিয়ে অনায়াসে যেতে পারতাম, এখন সেই দোকানের সামনে দিয়ে যেতে গেলে থামতে হয়।

“এটা কী হচ্ছে?”

আমি বুঝতে পারলাম – নিষেধ করলেই জিনিসের প্রতি আকর্ষণ বাড়ে।

আরাশকে বলি, “খেলনা কিনে দেব না।” তখন সে সেই খেলনার জন্য আরো জেদ করে।

আমি নিজেকে বলি, “মিষ্টি খাব না।” তখন মিষ্টির জন্য আরো লোভ হয়।

তৃতীয় দিন অফিস থেকে ফেরার পথে একটা রসগোল্লার দোকানে ঢুকে গেলাম।

“দুইটা রসগোল্লা।”

খেলাম। অপূর্ব স্বাদ।

“আরো দুইটা।”

খেলাম।

“আজকের জন্য শেষ। কাল থেকে আবার ডায়েট।”

এভাবে চলতে থাকল। দিনে ডায়েটের প্রতিজ্ঞা, সন্ধ্যায় ভাঙা।

একদিন হ্যাপি বলল, “হায়দার, তুমি ডায়েট করার কথা বলে আগের চেয়ে বেশি খাচ্ছো।”

আমি লজ্জা পেলাম। “তুমি কীভাবে বুঝলে?”

“তুমি ডায়েট করার কথা বলার পর থেকে রান্নাঘরে বার বার আস। আগে আসতে না।”

সত্যি কথা। ডায়েট করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকে খাবারের প্রতি আমার মনোযোগ বেড়েছে।

“আমার সমস্যাটা কী?” আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম।

আমি বুঝলাম – আমি ডায়েটকে শাস্তি হিসেবে দেখছি। খাবার থেকে নিজেকে বঞ্চিত করা।

কিন্তু যখন কোনো কিছু থেকে নিজেকে বঞ্চিত করি, তখন সেই জিনিসের প্রতি লোভ আরো বেড়ে যায়।

“তাহলে সমাধান কী?”

আমি বুঝলাম – ডায়েট মানে খাবার ছাড়া নয়। ডায়েট মানে সঠিক খাবার।

আমি হ্যাপিকে বললাম, “আমি ভুল করছিলাম। আমি কম খেতে চাইছিলাম। কিন্তু কম খেলে লোভ বাড়ে। আমি এখন থেকে ভালো খাব।”

“মানে?”

“মানে বেশি সবজি। ফল। পানি। আর ধীরে ধীরে খাব। তাড়াহুড়ো করব না।”

এই পদ্ধতিতে আমার লোভ কমল। কারণ আমি নিজেকে বঞ্চিত করছি না। শুধু বদলে দিচ্ছি।

ডায়েট একটা সংগ্রাম নয়। একটা ভারসাম্য।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *