ব্লগ

অ্যালগরিদমের খাঁচায় মানুষ

নভেম্বর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ সকালে লেখার খাতা নিয়ে বসেছি। হঠাত দেখি হ্যাপি ফোনে কিছু একটা দেখছে। মুখ গম্ভীর। চোখে একটা অদ্ভুত খালি ভাব।

“কী দেখছ?” জিজ্ঞেস করলাম।

“কিছু না,” বলে ফোনটা সাইড টেবিলে রাখল। “শুধু ফেসবুকে স্ক্রল করছিলাম।”

কিন্তু তার চোখের ভেতর যে ফাঁকা ভাবটা দেখলাম, সেটা “কিছু না” বলে মনে হলো না।

আমি ভাবি – আমরা কি আসলেই সোশ্যাল মিডিয়া দেখি? নাকি সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের দেখায় যা সে চায়?

আমার নিজের অভিজ্ঞতা বলি। যখন লিখতে বসি, মাঝে মাঝে রেফারেন্সের জন্য গুগল করি। একবার “একাকীত্ব” শব্দটা সার্চ করেছিলাম। তারপর থেকে আমার ফিডে একাকীত্ব নিয়ে হাজারো পোস্ট আসতে শুরু করল। দুঃখের গান, বিষণ্ণতার ছবি, ভাঙা হৃদয়ের স্ট্যাটাস।

অ্যালগরিদম বুঝে গেল আমি দুঃখী। তারপর আমাকে আরও দুঃখী করার জন্য আরও দুঃখের কন্টেন্ট পরিবেশন করতে লাগল।

এটাই কি সোশ্যাল মিডিয়ার সবচেয়ে ভয়ানক দিক? সে আমাদের একটা মুড ধরে নেয় আর সেই মুডেই আটকে রাখে?

আরাশ একদিন প্রশ্ন করেছিল, “বাবা, ফোনে কেন সবাই সুখী দেখায়?” বারান্দায় বসে রাস্তার মানুষ দেখতে দেখতে সে বলেছিল, “কিন্তু রাস্তায় তো সবাই আলাদা রকম।”

আরাশের এই পর্যবেক্ষণ আমাকে ভাবিয়ে তুলল। সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা দেখি curated জীবন। অ্যালগরিদম আমাদের দেখায় perfect জীবন, perfect খুশি, perfect দুঃখ। কিন্তু জীবন তো perfect নয়। জীবন আরাশের দেখা রাস্তার মানুষগুলোর মতো – বিভিন্ন রকম।

কিন্তু যখন আমরা বারবার perfect content দেখি, তখন আমাদের নিজেদের imperfect জীবন আমাদের কাছে ছোট লাগে। একাকী লাগে।

হ্যাপি যখন ফোনে স্ক্রল করে, সে দেখে অন্যদের সাজানো-গোছানো ঘর। আমাদের ফুলের গাছগুলো তার কাছে ছোট মনে হয়। তার রান্না সাধারণ মনে হয়। আমার অনিয়মিত চাকরি তার কাছে ব্যর্থতা মনে হয়।

অ্যালগরিদম আমাদের বলে: “তুমি যথেষ্ট নও।” আর এই “যথেষ্ট নও” বোধটাই আমাদের একাকী করে তোলে।

আমি লক্ষ করেছি, যেদিন আমি ফোন কম ব্যবহার করি, সেদিন আমার মন ভালো থাকে। আমাদের ছোট্ট সংসার, হ্যাপির হাসি, আরাশের প্রশ্ন – সবকিছু স্বাভাবিক লাগে। যথেষ্ট লাগে।

কিন্তু ফোন খুললেই অন্য জগৎ। সেখানে সবাই সফল, সবাই খুশি, সবার জীবন complete। আমার জীবন incomplete মনে হয়।

এই যে তুলনা – এটাই অ্যালগরিদমের খাদ্য। সে আমাদের असंतुष्ट রাখে যাতে আমরা আরও scroll করি। আরও খুঁজি। আরও তুলনা করি।

অ্যালগরিদম জানে আমাদের দুর্বলতা। সে জানে আমরা validation চাই। সে জানে আমরা belonging চাই। কিন্তু সে আমাদের fake validation দেয়। আমাদের দেখায় আমরা একটা community-র part, কিন্তু আসলে আমরা একা একা scroll করি।

এটা অদ্ভুত পরিস্থিতি। আমরা হাজার হাজার মানুষের সাথে “connected” কিন্তু আসলে disconnected। আমরা সবার update জানি কিন্তু কারো সাথে আসল কথা বলি না।

আমি ভাবি – যখন আমাদের টিভি ছিল না, তখন আমরা কম একাকী ছিলাম। পাড়ার মানুষদের সাথে আড্ডা দিতাম। এখন আমরা global community-র সদস্য কিন্তু local community থেকে বিচ্ছিন্ন।

অ্যালগরিদম আমাদের দূরের মানুষদের কাছাকাছি এনেছে, কিন্তু কাছের মানুষদের দূরে নিয়ে গেছে।

আমার মনে হয় অ্যালগরিদম আমাদের একাকীত্ব খাওয়ায় এভাবে: সে আমাদের বাস্তব জীবনকে ছোট করে দেখায়। আমাদের বোঝায় আমাদের জীবন incomplete। তারপর সেই incompleteness fill করার জন্য আরও content দেয়। আরও scroll করতে বলে।

কিন্তু আসল সমস্যা হলো – এই virtual connection আমাদের real connection করার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। আমরা message করি কিন্তু মুখোমুখি কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করি।

আজ সন্ধ্যায় হ্যাপি যখন ফিরে এল, আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কী মনে কর আমাদের জীবন incomplete?”

সে অবাক হয়ে বলল, “কেন? আমার তো মনে হয় আমরা ভালোই আছি।”

“তাহলে ফোনে scroll করার পর মনটা খারাপ হয় কেন?”

সে একটু ভেবে বলল, “হয়তো কারণ ওখানে সবার জীবন perfect দেখায়।”

এই কথায় আমি বুঝলাম – অ্যালগরিদম আমাদের যে একাকীত্ব খাওয়ায়, সেটা artificial একাকীত্ব। আমরা আসলে একা নই। কিন্তু algorithm আমাদের মনে করায় যে আমরা একা।

সমাধান কী? হয়তো মাঝে মাঝে ফোন বন্ধ করে রাখা। বারান্দায় বসে আরাশের মতো রাস্তার মানুষ দেখা। হ্যাপির সাথে আসল কথা বলা।

আসল জীবনে ফিরে যাওয়া।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *