সকাল আটটায় অ্যালার্ম বাজে। উঠে পড়ি। দাঁত মাজি। স্নান করি। নাস্তা খাই। অফিসে যাই। কাজ করি। বাড়ি ফিরি। খাই। ঘুমাই। এই চক্র। প্রতিদিন। একই। অবিকল।
নিরাপদ। নির্ভরযোগ্য। কিন্তু জীবন্ত?
বারান্দায় একটা পাখির খাঁচা দেখি। পাখিটা প্রতিদিন একই ডাল থেকে আরেক ডালে লাফায়। নিয়মিত খাবার পায়। সুরক্ষিত। কিন্তু উড়তে পারে না।
আমি কি সেই পাখি?
গত রাতে একটা স্বপ্ন দেখেছিলাম। নিজেকে দেখলাম একটা ছোট্ট গ্রামে। কৃষিকাজ করছি। মাটি ছুঁয়ে ফসল ফলাচ্ছি। হাতে মাটির গন্ধ। চোখে অসীম আকাশ। কিন্তু জাগলাম অফিসের টেবিলে। কম্পিউটারের স্ক্রিনে এক্সেল শিট।
“তুমি যদি চাকরি ছেড়ে দাও, কী খাবে?” এই প্রশ্নটা আমার স্বপ্নগুলোকে দম বন্ধ করে মারে।
খাবো কী? এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারি না বলে আমি বন্দি। নিরাপত্তার বন্দি। বেতনের বন্দি। সামাজিক স্ট্যাটাসের বন্দি।
আমার ভিতরে একটা শিল্পী লুকিয়ে আছে। সে ছবি আঁকতে চায়। কবিতা লিখতে চায়। গান গাইতে চায়। কিন্তু অফিসের ড্রেস কোড তাকে স্যুট পরতে বাধ্য করে। অফিসের সময়সূচি তার সৃজনশীলতাকে নয়টা-পাঁচটার কাঠামোয় আটকে রাখে।
“তুমি স্বাধীন।” কে বলেছে? যে মানুষ বেঁচে থাকার জন্য অন্যের পছন্দের কাজ করতে বাধ্য, সে কীভাবে স্বাধীন?
কিন্তু চাকরি ছেড়ে দিলে? পরিবার? সংসার? দায়িত্ব? এগুলো কি স্বাধীনতার পথে বাধা, নাকি স্বাধীনতার অর্থ?
মাঝে মাঝে সহকর্মীদের দেখি। তারাও একই দ্বিধায়। কেউ আঁকার ক্লাস করতে চায়। কেউ ভ্রমণ করতে চায়। কেউ নিজের ব্যবসা করতে চায়। কিন্তু সবাই “নিরাপত্তা” নামক এক অদৃশ্য দেয়ালের পেছনে।
আত্মা চায় উড়তে। কিন্তু শরীর চায় নিরাপদ থাকতে। দুটোর মাঝে আমি দুমড়ে-মুচড়ে যাই।
রাতে নামাজ পড়ার সময় আল্লাহর কাছে দোয়া করি। “হে আল্লাহ, আমাকে পথ দেখাও।” কিন্তু পথ তো দেখাচ্ছেন। সমস্যা হচ্ছে, সেই পথে হাঁটার সাহস নেই।
কখনো ভাবি, নিরাপত্তা আর স্বাধীনতা কি একসাথে থাকতে পারে? নাকি একটা পেতে হলে আরেকটা বিসর্জন দিতে হয়?
আমি কি সেই নিরাপত্তা পাওয়ার জন্য নিজেকে বিক্রি করে দিয়েছি? দিনে আট ঘণ্টা আত্মাকে ঠান্ডা ঘরে তালা দিয়ে রেখে শরীর দিয়ে কাজ করি।
খাঁচার পাখি কি জানে সে উড়তে পারত? নাকি খাঁচায় এত দিন থাকার পর ভুলে গেছে ডানার ব্যবহার?
আমার ডানা কোথায়? নাকি কেটে ফেলেছি নিরাপত্তার বিনিময়ে?
একটু ভাবনা রেখে যান