ব্লগ

খালি ফ্ল্যাটে প্রথম রাত

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

রাত ১১:৩০

ফ্ল্যাটের চাবি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি দরজার সামনে। সোনিয়া আপু। ৪২ বছর বয়স। ১৮ বছর বিয়ে ছিল। আজ তালাক হয়েছে।

“ভাই, ভেতরে যাবেন?” আমি বলি।

সে হাসে। কিন্তু হাসিটা কেমন যেন। “যাব কোথায়? এই তো আমার নতুন ঘর।”

চাবি ঘোরায়। দরজা খোলে। ভিতরে অন্ধকার।

“লাইট জ্বালাবেন?”

“না। অন্ধকারেই বসি। আলো দেখতে ইচ্ছে করছে না।”

রাত ১২:০০

ফ্লোরে বসে আছি। সোনিয়া আপু জানালার পাশে।

“কী মনে হচ্ছে?” আমি জিজ্ঞেস করি।

“মনে হচ্ছে মরে গেছি। কিন্তু এখনো শ্বাস নিচ্ছি।”

“এই সিদ্ধান্ত নিতে কষ্ট হয়েছে?”

“কষ্ট? হাসাবেন না। গত পাঁচ বছর ধরে মরে ছিলাম। আজ বেঁচে উঠেছি।”

চুপ থাকি।

“জানেন, সবাই বলেছে ভুল করছি। ৪২ বছর বয়সে তালাক? কে বিয়ে করবে? কীভাবে চলবে?”

“আপনি কী ভেবেছেন?”

“ভেবেছি, বিয়ে না করলে মরে যাব? চলতে না পারলে থেমে যাব?”

রাত ১২:৩০

“প্রথমে ভয় লেগেছিল,” সে বলে। “কোথায় থাকব? কী খাব? টাকা কোথায় পাব?”

“এখন?”

“এখন মনে হয় সব উত্তর আমার ভিতরেই ছিল। শুধু খুঁজতে হয়নি।”

“মানে?”

“চাকরি করতে পারি। রান্না করতে পারি। মানুষের সাথে মিশতে পারি। তাহলে?”

সত্যি। তাহলে আর কিসের ভয়?

রাত ১:০০

“সবচেয়ে ভয় কিসের ছিল?”

“একা থাকার। একা খাওয়ার। একা ঘুমানোর।”

“এখন?”

“এখন মনে হয় একা মানে কি? একা থাকলে নিজের সাথে থাকা। নিজেকে চেনা।”

উঠে দাঁড়ায়। জানালা খোলে।

“আহ! কী ভালো বাতাস। বাড়িতে জানালা খুলতে সাহস হতো না। মনে হতো স্বামী অপছন্দ করবে।”

“আরো কী করতে সাহস হতো না?”

“অনেক কিছু। হাসতে। কান্না করতে। গান শুনতে। বই পড়তে। ইচ্ছেমতো কাপড় পরতে।”

রাত ১:৩০

“আমি এখন মুক্ত,” বলে সে। “১৮ বছর পর মুক্ত।”

“স্বামীর সাথে সমস্যা কী ছিল?”

“সমস্যা ছিল না। সমস্যা ছিল আমার সাথে। আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম।”

বসে পড়ে আবার।

“বিয়ের পর আমি শুধু স্ত্রী হয়ে গেছিলাম। মা হয়ে গেছিলাম। কিন্তু সোনিয়া কোথায় গেল?”

“এখন?”

“এখন সোনিয়াকে ফিরিয়ে আনব।”

রাত ২:০০

“বাচ্চাদের নিয়ে চিন্তা?”

“অবশ্যই। কিন্তু দেখেন, আমি যখন অসুখী ছিলাম, বাচ্চারাও অসুখী ছিল। আমি খুশি হলে ওরাও খুশি হবে।”

“ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা?”

“কাল সকালে উঠব। চা বানাব। নিজের পছন্দের গান শুনব। তারপর চাকরি খুঁজব।”

“ভয় নেই?”

“ভয় আছে। কিন্তু সেই ভয় রোমাঞ্চকর। যেমন নতুন জায়গায় ঘুরতে গেলে হয়।”

রাত ২:৩০

আমি উঠি যাওয়ার জন্য।

“ধন্যবাদ,” সে বলে। “পাশে থাকার জন্য।”

“আজ রাতে ঘুম হবে?”

“হবে। গভীর ঘুম। গত কয়েক বছরে এমন ঘুম হয়নি।”

“কেন?”

“কারণ আজ আমি আমার নিজের বিছানায় ঘুমাব। আমার নিজের ইচ্ছায়।”

দরজার কাছে এসে বলে, “জানেন কী সবচেয়ে বড় সাহস?”

“কী?”

“নিজের কথা শোনার সাহস।”

রাত ৩:০০

বাড়ি ফিরে ভাবি, সোনিয়া আপুর মতো সাহস আমার আছে?

প্রয়োজন হলে একা দাঁড়ানোর সাহস?

প্রয়োজন হলে নতুন শুরু করার সাহস?

উত্তর জানি না। কিন্তু জানি, সাহস মানে ভয় না থাকা নয়।

সাহস মানে ভয় থাকলেও এগিয়ে যাওয়া।

আর সেই সাহস সবার ভিতরেই আছে। শুধু সময়ের অপেক্ষা।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *