ব্লগ

খালি পেটের গান

নভেম্বর ২০২৫ · 7 মিনিটে পড়া
শেয়ার

খালি পকেটের গল্প

আরাশ ঘুমিয়ে আছে। তার মুখে হাসি। ও জানে না, ওর বাবা আজ রাতে না খেয়ে শুয়েছে।

এই দৃশ্যটা আমাকে একই সাথে ভেঙে দেয়, আবার শক্ত করে দেয়। কীভাবে? সেটা বলি।

রাত তখন এগারোটা হবে। হ্যাপি রান্নাঘরে গিয়ে ফ্রিজ খুলে দাঁড়িয়ে ছিল অনেকক্ষণ। আমি জানতাম ভেতরে কিছু নেই। ও-ও জানত। তবু খুলে দাঁড়িয়ে রইল, যেন আশা করছে হঠাৎ কিছু একটা তৈরি হয়ে যাবে। তারপর দরজা বন্ধ করে চুপচাপ শুয়ে পড়ল। কিছু বলল না। আমিও বললাম না। কী বলব? যে কথা দুজনেই জানি, সেটা জোরে বললে কষ্টটা আরও বড় হয়ে যায়।

আমার পকেটে তখন ঠিক বাইশ টাকা। কালকের নাস্তার জন্য পাঁচটা ডিম কিনব নাকি বাসে করে অফিস যাব—এই হিসাব করছিলাম। দুটো একসাথে হবে না।

মানুষ যখন দারিদ্র্য শব্দটা শোনে, মাথায় আসে ছেঁড়া কাপড়, ভাঙা ঘর, হাত পাতা মানুষ। কিন্তু দারিদ্র্যের আসল চেহারা এরকম না। দারিদ্র্য হলো ফ্রিজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা স্ত্রীর নীরব মুখ। দারিদ্র্য হলো ছেলে যখন জিজ্ঞেস করে “বাবা, আইসক্রিম খাব” আর তুমি বলো “পরে খাব মা”—জানো যে সেই “পরে” কবে আসবে তুমি নিজেও জানো না। দারিদ্র্য হলো রাত তিনটায় জেগে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকা আর ভাবা, কাল যদি আরাশ অসুস্থ হয়, ডাক্তারের ফি কোথা থেকে আসবে?

এই ভাবনাগুলো মাথার ভেতর পাক খায়। ঘুম আসে না। ক্লান্তিতে চোখ জ্বলে, কিন্তু মাথা চুপ করে না।

গত মাসে আরাশের স্কুল থেকে নোটিশ এলো, বার্ষিক পিকনিকের জন্য পাঁচশো টাকা জমা দিতে হবে। আরাশ সেই নোটিশ হাতে নিয়ে এমন চোখে তাকাল, আমার বুকের ভেতরটা মুচড়ে গেল। বললাম, “দেব মা, চিন্তা করিস না।” ও চলে গেল। আমি বাথরুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে কাঁদলাম। চল্লিশ বছর বয়সে একটা পাঁচশো টাকার জন্য বাথরুমে লুকিয়ে কাঁদতে হচ্ছে—এই যন্ত্রণা কেউ বুঝবে না যে ভোগেনি।

পরের দিন অফিসের এক কলিগের কাছ থেকে ধার নিলাম। সে জিজ্ঞেস করল কেন দরকার। মিথ্যা বললাম। বললাম ওষুধ কিনতে হবে। সত্যি কথা বলতে পারলাম না। কেন? লজ্জা। এই লজ্জাটাও দারিদ্র্যের একটা অংশ যেটা কেউ বলে না।

কিন্তু জানো, এই একই দারিদ্র্য আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে যা কোনো বই শেখাতে পারত না।

আমি শিখেছি, প্রয়োজন আর লোভের মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক। আগে মনে হতো নতুন ফোন দরকার, নতুন জামা দরকার, গাড়ি দরকার। এখন জানি—খাবার দরকার, মাথা গোঁজার ঠাঁই দরকার, সন্তানের পড়ালেখা দরকার। বাকি সব? বাকি সব শুধু চাওয়া, দরকার না।

আমি শিখেছি, সুখ আসলে কোথায় থাকে। একদিন বিকেলে আরাশকে নিয়ে ছাদে গেলাম। কিছু করিনি, শুধু বসে রইলাম। ও আমার কোলে মাথা রেখে আকাশ দেখছিল। হঠাৎ বলল, “বাবা, তুমি সবচেয়ে ভালো।” ব্যস। ওই একটা কথায় আমার ভেতরে যে জিনিসটা হলো, সেটার জন্য বিশ লাখ টাকা দিলেও কেনা যেত না। সেদিন বুঝলাম, সুখ টাকায় কেনা যায় না। সুখ মুহূর্তে বানানো হয়।

আমি শিখেছি, কম থাকলে ভাগাভাগিটা কত সুন্দর হয়। যেদিন বাসায় মাত্র দুইটা রুটি থাকে, সেদিন তিনজন মিলে ভাগ করে খাই। সেই খাবারের একটা অন্যরকম স্বাদ আছে। পেট ভরে না, কিন্তু মন ভরে যায়। কারণ একা খেলে পেট ভরে, একসাথে খেলে সম্পর্ক ভরে।

পরশু রাস্তায় একটা বুড়ো মানুষকে দেখলাম। হাত বাড়িয়ে ভিক্ষা চাইছে। মানুষ এড়িয়ে যাচ্ছে, কেউ মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে, কেউ এমনভাবে হাঁটছে যেন লোকটা অদৃশ্য। কিন্তু বুড়ো থামল না। পরের জনের কাছে হাত বাড়াল। তার পরের জনের কাছে। কোনো রাগ নেই চোখে, কোনো হতাশা নেই মুখে। শুধু চেষ্টা।

আমি দাঁড়িয়ে দেখলাম অনেকক্ষণ। মনে হলো, এই মানুষটা আমার থেকে অনেক শক্তিশালী। আমি হলে দশজনের কাছে না পেয়ে বাড়ি চলে যেতাম। কিন্তু সে জানে, থামলে মরতে হয়। চেষ্টা করলে অন্তত একটা সম্ভাবনা থাকে।

দারিদ্র্য একটা পরীক্ষা। এটা প্রতিদিনের পরীক্ষা। সকালে ঘুম থেকে উঠে পরীক্ষা শুরু হয়, রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে শেষ হয়। কখনো পাশ করি, কখনো ফেল করি। কিন্তু পরদিন আবার নতুন করে শুরু হয়। এই পরীক্ষায় কোনো ছুটি নেই।

এই পরীক্ষায় দুই ধরনের মানুষ দেখেছি। একদল ভেঙে পড়ে। মদ ধরে, জুয়া ধরে, পরিবার ছেড়ে চলে যায়, কেউ কেউ আরও খারাপ কিছু করে। তাদের দোষ দিই না। সবার সহ্যশক্তি এক না। কিন্তু আরেকদল আছে যারা প্রতিদিন উঠে দাঁড়ায়। পেটে ক্ষুধা নিয়ে কাজে যায়। মাথা উঁচু রাখে। সন্তানের সামনে হাসে। আমি সেই দলে থাকতে চাই।

কেন থাকতে চাই? আরাশের জন্য। আমি যদি ভেঙে পড়ি, ও দেখবে বাবা হেরে গেছে। আর বাবাকে হারতে দেখলে সন্তান শেখে যে হেরে যাওয়া স্বাভাবিক। আমি ওকে সেটা শেখাতে চাই না। আমি চাই ও দেখুক, তার বাবা কম পেয়েছে কিন্তু লড়েছে। তাহলে ও যখন বড় হয়ে কষ্টে পড়বে, মনে করবে—বাবা পেরেছিল, আমিও পারব।

এই যে উত্তরাধিকার, এটা টাকায় দেওয়া যায় না। এটা জীবন দিয়ে দিতে হয়।

গরিব মানুষদের নিয়ে একটা কথা সবাই ভুল বোঝে। মনে করে আমরা সব সময় দুঃখে থাকি। আসলে তা না। আমরা হাসি। আমরা রসিকতা করি। আমরা স্বপ্ন দেখি। শুধু আমাদের হাসির পেছনে একটা চিন্তা থাকে যেটা ধনী মানুষের থাকে না—কাল কী হবে? এই চিন্তাটা সব সময় পেছনে থাকে, একটা ছায়ার মতো। কিন্তু আমরা শিখে গেছি সেই ছায়া নিয়েই হাঁটতে।

আজ রাতে আবার আরাশ ঘুমিয়ে আছে। ওর মুখে সেই একই নির্ভার হাসি। ও জানে না বাইরে পৃথিবী কত কঠিন। ও জানে না ওর বাবা প্রতিদিন কী লড়াই লড়ে। ভালোই। এই না-জানাটাই ওর শৈশব। আমি চাই এই শৈশব যতদিন সম্ভব অক্ষত থাকুক।

কাল সকালে আবার উঠব। আবার বের হব। আবার খুঁজব কোথায় কী করা যায়। হয়তো কিছু পাব, হয়তো পাব না। কিন্তু লড়াই থামাব না।

কারণ আমি বুঝে গেছি, দারিদ্র্য আমার পরিচয় না। দারিদ্র্য আমার পরিস্থিতি। পরিচয় হলো আমি একজন বাবা যে তার সন্তানের জন্য যেকোনো কিছু করতে পারে। পরিচয় হলো আমি একজন মানুষ যে হেরে যেতে রাজি না।

আমার পকেট খালি। কিন্তু আমার মন খালি না। আমার স্বপ্ন খালি না। আমার চেষ্টা খালি না। আর যতদিন এগুলো আছে, ততদিন আমি আসলে গরিব না। গরিব সেই যে চেষ্টা ছেড়ে দিয়েছে। আমি ছাড়িনি।

ঘুমাতে যাওয়ার আগে আরাশের কপালে একটা চুমু দিলাম। ফিসফিস করে বললাম, “বাবা লড়বে, তোর জন্য।” ও শুনতে পেল না। শোনার দরকার নেই। শুধু আমি জানি, এই প্রতিশ্রুতি আমাকে কাল সকালে আবার উঠতে সাহায্য করবে।

এটাই আমার গল্প। খালি পকেটের গল্প। কিন্তু ভরা মনের গল্প।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *