জুমার নামাজে বসে আছি। ইমাম সাহেব খুতবা দিচ্ছেন। বলছেন আখিরাতের কথা। মৃত্যুর পরের হিসাবের কথা। কিন্তু আমি ভাবছি এই দুনিয়ার হিসাব।
“সেদিন প্রত্যেকে তার আমলনামা দেখবে,” বলছেন ইমাম সাহেব। আমি মনে মনে ভাবি, আমার আমলনামায় কী আছে? কত নেকি, কত গুনাহ?
কিন্তু সেই হিসাবের চেয়ে এই দুনিয়ার হিসাব বেশি মাথায় ঘুরছে। এই মাসে বেতন পেয়েছি ৩৫ হাজার। খরচ হয়েছে ৪২ হাজার। ৭ হাজার ঘাটতি। এই ঘাটতি কিভাবে পূরণ করব?
“আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘ওয়া মান ইয়াত্তাকিল্লাহা ইয়াজআল লাহু মাখরাজা।'” ইমাম সাহেব আয়াত পড়ছেন। যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উপায় বের করে দেন। কিন্তু আমার উপায় দেখতে পাচ্ছি না।
আরাশের স্কুল ফি বাকি। হ্যাপির ওষুধ কিনতে হবে। বাড়ি ভাড়া দিতে হবে। এসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে খুতবার কথা আর কানে ঢুকছে না।
“দুনিয়া হলো আখিরাতের জন্য চাষের ক্ষেত,” বলছেন ইমাম সাহেব। আমি ভাবি, আমি তো এই চাষের ক্ষেতেই আটকে আছি। পরকালের জন্য কিছু চাষ করতে পারছি না।
৩৯ বছর বয়স। এর মধ্যে কত ভালো কাজ করেছি? কত খারাপ কাজ করেছি? অফিসে মিথ্যা বলেছি, কাস্টমারদের ঠকিয়েছি, অসহায়দের সাহায্য করিনি। এসব কি আমার আমলনামায় লেখা হচ্ছে?
“রোজ কিয়ামতে আল্লাহ প্রত্যেকের হিসাব নেবেন।” এই কথা শুনে আমার বুকটা ধড়ফড় করে ওঠে। আল্লাহ আমার হিসাব নিলে কী উত্তর দেব?
তিনি জিজ্ঞেস করবেন, “তোমাকে যে চাকরি দিয়েছিলাম, সেটা দিয়ে কী করেছ?”
আমি কী উত্তর দেব? বলব, “আমি টাকা কামিয়েছি। পরিবার চালিয়েছি। কিন্তু আপনার রাস্তায় কিছু খরচ করিনি?”
তিনি জিজ্ঞেস করবেন, “তোমার পাশের বাড়ির লোকটা অসুস্থ ছিল, তাকে সাহায্য করেছ?”
আমি কী বলব? করিনি। আমার নিজের সমস্যা নিয়েই এত ব্যস্ত ছিলাম।
“তোমার অফিসে একজন দরিদ্র সহকর্মী ছিল, তার কোনো সাহায্য করেছ?”
করিনি। ভেবেছি, আমার নিজেরই টাকা নেই।
খুতবা চলতে থাকে। ইমাম সাহেব বলেন, “আল্লাহর রহমত অসীম। তিনি ক্ষমাশীল।” এই কথা শুনে একটু স্বস্তি লাগে। হয়তো আমার এত গুনাহের পরেও তিনি ক্ষমা করবেন।
কিন্তু ক্ষমা তো তাদের জন্য যারা তাওবা করে। আমি কি সত্যিকারের তাওবা করেছি? নাকি মুখে বলি, মনে অন্য কিছু?
“সালাতের পর দোয়া করুন,” বলছেন ইমাম সাহেব। “আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান।” আমি ভাবি, আমি তো প্রতিদিনই ক্ষমা চাই। কিন্তু পরদিন আবার একই ভুল করি।
যেমন প্রতিদিন বলি আর মিথ্যা বলব না। কিন্তু অফিসে গিয়ে আবার মিথ্যা বলি। এভাবে তো হয় না।
ইমাম সাহেব বলেন, “জীবন খুব ছোট। কখন শেষ হয়ে যাবে জানি না।” আমার মনে পড়ে বাবার মৃত্যুর কথা। হঠাৎ করেই চলে গেছেন। আমিও তো যেকোনো সময় যেতে পারি।
যদি আজ আমার মৃত্যু হয়, তাহলে আমার আমলনামায় কী থাকবে? বেশিরভাগই দুনিয়ার কাজ। অফিসের কাজ, টাকা কামানো, সংসার চালানো। আল্লাহর জন্য কী করেছি?
খুতবা শেষ হওয়ার আগেই আমার মনে একটা ছোট হিসাব তৈরি হয় গেল।
ভালো কাজ: পরিবারের দেখাশোনা, বাবা-মার খেদমত, নিয়মিত নামাজ (যদিও মনোযোগ কম)।
খারাপ কাজ: মিথ্যা বলা, মানুষকে ঠকানো, গরিবের সাহায্য না করা, নামাজে মনোযোগ না দেওয়া।
হিসাব মিলিয়ে দেখি, খারাপের পাল্লা ভারী।
নামাজ শেষে দোয়া করি, “হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করুন। আমাকে ভালো মানুষ হওয়ার তাওফিক দিন।”
কিন্তু জানি, শুধু দোয়া করে হবে না। কাজ করতে হবে। আমার জীবনের হিসাব ঠিক করতে হবে।
একটু ভাবনা রেখে যান