আজ সকালে আরাশের স্কুলের খাতায় একটা ছবি দেখলাম। সে একটা গাছ এঁকেছে। শিকড়, কাণ্ড, পাতা—সব আছে। কিন্তু সেটা শুধু একটা ছোট্ট পাতার ভেতরে।
“এটা কী?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“স্যার বলেছেন—একটা পাতার মধ্যে পুরো গাছের তথ্য আছে। সেই পাতা থেকে আরেকটা গাছ জন্মানো যায়।”
আমি অবাক হলাম। একটা পাতার মধ্যে পুরো গাছ?
“হ্যাঁ বাবা। একটা কোষের মধ্যে পুরো জীবের ডিএনএ থাকে। সেখান থেকে পুরো শরীর তৈরি হয়।”
আরাশের কথা শুনে আমার মনে একটা চিন্তা এলো। আমার জীবনও কি এরকম? একটা ছোট্ট ঘটনার মধ্যে কি আমার পুরো জীবনের প্যাটার্ন লুকিয়ে আছে?
আমি ভাবলাম—আজ সকালের ঘটনাটা। চা খেতে খেতে হ্যাপির সাথে কথা বলছিলাম। সে বলেছিল, “তোমার চাকরি নিয়ে চিন্তা করো না। সব ঠিক হয়ে যাবে।” আমি রেগে গিয়ে বলেছিলাম, “তুমি বুঝবে না।”
এই একটা মুহূর্তে কি আমার পুরো চরিত্র প্রকাশ পেয়েছে? আমার অহংকার, হীনমন্যতা, ভয়—সব?
যেমন হোলোগ্রামে একটা টুকরো ভাঙলে পুরো ছবি দেখা যায়, তেমনি আমার এই একটা প্রতিক্রিয়ায় আমার পুরো ব্যক্তিত্ব?
দুপুরে জামিউরের সাথে ফোনে কথা হলো। সে বলল, “তুই একটা কাজ পাবি।” আমি বললাম, “পাব না। আমার কপাল খারাপ।”
এই একটা বাক্যেও কি আমার জীবনদৃষ্টি প্রকাশ পেল? আমি কীভাবে ভাবি, কীভাবে দেখি—সব?
সন্ধ্যায় আরাশ খেলা থেকে ফিরে এসে বলল, “বাবা, আজ আমি গোল দিয়েছি। কিন্তু আমাদের দল হেরেছে।”
আমি বললাম, “তুমি ভালো খেলেছো। এটাই যথেষ্ট।”
আরাশ খুশি হয়ে গেল। আমার এই একটা প্রতিক্রিয়ায় কি আমার পিতৃত্বের পুরো দর্শন প্রকাশ পেল?
আমি বুঝলাম—আমাদের প্রতিটি কাজে, প্রতিটি কথায়, প্রতিটি প্রতিক্রিয়ায় আমাদের পুরো জীবনের প্যাটার্ন লুকিয়ে আছে।
যেমন একটা বীজে পুরো গাছের নকশা থাকে।
রাতে হ্যাপির কাছে ক্ষমা চাইলাম। সে বলল, “তুমি সবসময় এভাবে রেগে যাও। তারপর ক্ষমা চাও।”
আমি ভাবলাম—এই প্যাটার্নটা আমার পুরো জীবনে আছে। অফিসে, বন্ধুদের সাথে, এমনকি নিজের সাথেও।
প্রথমে রাগ। তারপর অনুশোচনা। তারপর ক্ষমা চাওয়া। এই চক্র বারবার।
এটা কি আমার জীবনের হোলোগ্রাম? প্রতিটি ছোট ঘটনায় এই একই প্যাটার্ন?
আমি আরো ভাবলাম। আমার কাজের প্যাটার্ন। শুরুতে উত্সাহ। মাঝখানে হতাশা। শেষে হাল ছেড়ে দেওয়া।
স্কুল-কলেজে এই প্যাটার্ন। চাকরিতে এই প্যাটার্ন। এমনকি শখের কাজেও।
তাহলে কি আমার ভেতরে একটা মৌলিক প্যাটার্ন আছে যা বারবার প্রকাশ পায়?
আমি আরাশকে লক্ষ করলাম। সেও এরকম। নতুন কিছু শুরু করে উত্সাহে। তারপর বোর হয়ে যায়। ছেড়ে দেয়।
হয়তো এটা আমার কাছ থেকে পেয়েছে। হয়তো পারিবারিক প্যাটার্ন।
আমার বাবাও এরকম ছিলেন। অনেক স্বপ্ন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারতেন না।
তাহলে কি এই প্যাটার্ন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে?
কিন্তু এর মানে কি এটা বদলানো যাবে না?
আমি ভাবলাম—যদি আমার জীবনের প্রতিটি অংশে আমার পুরো প্যাটার্ন থাকে, তাহলে যেকোনো অংশ বদলালে পুরো জীবন বদলাবে?
পরদিন একটা এক্সপেরিমেন্ট করলাম। সকালে হ্যাপি যখন কিছু বলল, আমি রাগ করলাম না। গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে শুনলাম।
দুপুরে অফিসে একটা সমস্যা হলো। আমার স্বভাব হতো হাল ছেড়ে দেওয়া। কিন্তু এবার ধৈর্য ধরে সমাধান খুঁজলাম।
সন্ধ্যায় আরাশ পড়তে বসল। পাঁচ মিনিট পর বলল, “করতে ইচ্ছে করছে না।” আমার স্বভাব হতো বকা দেওয়া। কিন্তু এবার বললাম, “ঠিক আছে। একটু বিশ্রাম নাও। তারপর করো।”
রাতে ভাবলাম—আজ আমি তিনটা জায়গায় আমার পুরনো প্যাটার্ন ভেঙেছি।
ফলাফল? দিনটা অনেক ভালো কেটেছে। হ্যাপি খুশি। আরাশ সন্তুষ্ট। আমিও শান্ত।
তাহলে কি সত্যিই একটা অংশ বদলালে পুরো প্যাটার্ন বদলায়?
আরো কয়েকদিন এই এক্সপেরিমেন্ট চালালাম। প্রতিদিন ছোট ছোট জায়গায় পুরনো প্যাটার্ন ভাঙার চেষ্টা।
ধীরে ধীরে মনে হলো—আমি বদলাচ্ছি। আমার প্রতিক্রিয়া বদলাচ্ছে। আমার চিন্তাভাবনা বদলাচ্ছে।
হ্যাপি একদিন বলল, “তুমি আলাদা লাগছো।”
“কেমন আলাদা?”
“কম রাগ করছো। বেশি ধৈর্য রাখছো। মনে হয় তুমি বেড়ে উঠেছো।”
আমি বুঝলাম—আমার জীবনের হোলোগ্রাম বদলাচ্ছে। নতুন প্যাটার্ন তৈরি হচ্ছে।
আরাশও এই পরিবর্তন অনুভব করল। সে বলল, “বাবা, তুমি এখন আমার সাথে বেশি ধৈর্য রাখো।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “ভালো লাগে?”
“খুব ভালো। আমারও মন ভালো থাকে।”
আমি বুঝলাম—আমার প্যাটার্ন বদলে আরাশের প্যাটার্নও বদলাচ্ছে। হয়তো সে একদিন আমার চেয়ে ভালো মানুষ হবে।
এই উপলব্ধি আমাকে আরো উৃসাহিত করল। আমি বুঝলাম—জীবনের হোলোগ্রাম তত্ত্ব শুধু বোঝার জন্য নয়। বদলানোর জন্যও।
আমি যদি একটা অংশে ভালো প্যাটার্ন তৈরি করতে পারি, তাহলে পুরো জীবনে সেই প্যাটার্ন ছড়িয়ে যাবে।
এবং সবচেয়ে ভালো ব্যাপার—এটা শুরু করতে হবে এখনই। এই মুহূর্তেই।
কারণ এই মুহূর্তেই আমার পুরো জীবনের প্যাটার্ন লুকিয়ে আছে।
একটু ভাবনা রেখে যান