ব্লগ

খননকার্যে আমি

নভেম্বর ২০২৫ · 6 মিনিটে পড়া
শেয়ার

প্রথম স্তর: মাটির উপরিভাগ

আজ সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু আয়না নয়, এ একটা খননক্ষেত্র। আর আমি প্রত্নতত্ত্ববিদ। নিজের মুখে খুঁজছি – কোনটা আমি? কোনটা সময়ের পলি?

হাতে একটা কাল্পনিক কোদাল। খুঁড়তে শুরু করি।

বাবার কণ্ঠ, ১৯৯৮ সাল থেকে ভেসে আসে: “সফল হতে হলে…”

আমার কণ্ঠ, আজ: “কিন্তু বাবা, সফল মানে কী?”

বাবার কণ্ঠ নিস্তব্ধ। মৃত মানুষের জবাব নেই।

দ্বিতীয় স্তর: শৈশবের খোলস

আরো গভীরে খুঁড়ি। পাই সাত বছরের হায়দারের একটা খেলনা গাড়ি। ভাঙা। চাকা নেই। কিন্তু সেই ছেলেটি এটা নিয়ে কী স্বপ্ন দেখত! ভাবত বড় হয়ে সত্যিকারের গাড়ি কিনবে।

এখন আমি চুয়াল্লিশ। গাড়ি নেই। কিন্তু স্বপ্নের গাড়িটা কোথায় গেল?

সমাজের কণ্ঠ: “ব্যর্থ মানুষ।” আমার অচেতনের কণ্ঠ: “নাকি মুক্ত মানুষ?”

খননের তৃতীয় দিন। এখানে সময় রৈখিক নয়। ভূতকাল আর ভবিষ্যৎ একসাথে মিশে আছে।

তৃতীয় স্তর: মুখোশের স্তূপ

আরো গভীরে। পাই অসংখ্য মুখোশ। প্রতিটি চাকরির একটা। প্রতিটি সম্পর্কের একটা। প্রতিটি দিনের একটা।

“দায়িত্বশীল স্বামী” – এই মুখোশটা সবচেয়ে ভারী। “কর্মক্ষম কর্মচারী” – এটা সবচেয়ে মিথ্যা। “ধার্মিক মুসলিম” – এটা সবচেয়ে জটিল।

হ্যাপি রান্নাঘর থেকে ডাকছে। “খেতে আস।” কিন্তু আমি খুঁড়তে থাকি। এই খনন বন্ধ হওয়ার নয়।

হ্যাপির মনোলোগ, পাশের ঘর থেকে ভেসে আসে: “ও আবার সেই চিন্তায় ডুবে গেছে। কী যে ভাবে সারাক্ষণ! আমি বুঝি না, স্বাভাবিক হয়ে থাকতে পারে না কেন? অন্য পুরুষদের মতো। যা আছে তাই নিয়ে খুশি থাকতে পারে না?”

আমার ভবিষ্যৎ সত্তার কণ্ঠ, ২০৫০ সাল থেকে: “হায়দার, তুমি ঠিক পথে ছিলে। খুঁড়ে যাও। তলিয়ে দেখো।”

চতুর্থ স্তর: ভয়ের ফসিল

এখানে পাই আমার সবচেয়ে গভীর ভয়ের ফসিল। ভয় – আমি ভুল পথে। সমাজ ঠিক, আমি ভুল।

কিন্তু ভয়ের পাশেই পাই একটা অদ্ভুত জিনিস। একটা কম্পাস। ভাঙা নয়। সুই সবসময় একই দিকে নির্দেশ করে। সেই দিক কোনো ভৌগোলিক দিক নয়। সেই দিক – আমার সত্যের দিক।

আরাশের কণ্ঠ, আগামীকাল থেকে: “বাবা, তুমি কেন অন্যদের মতো নও?”

আমার উত্তর, এখন এবং সর্বকালের জন্য: “কারণ আমি আমি। অন্য কেউ নই।”

পঞ্চম স্তর: অস্তিত্বের নিউক্লিয়াস

সবচেয়ে গভীরে। এখানে শুধু নিস্তব্ধতা। এবং একটি প্রশ্ন, পাথরে খোদাই করা:

“আমি কী প্রমাণ করতে চাই?”

এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। এই প্রশ্নটাই উত্তর।

আল্লাহর নিকটতম নাম, আস-সমাদ, নিস্তব্ধতা থেকে ধ্বনিত হয়: “তুমি প্রমাণ নও। তুমি অস্তিত্ব। তুমি থাকো। বাকি সব অপ্রয়োজনীয়।”

খননের সপ্তম দিন। নাকি সপ্তম বছর? সময় এখানে অর্থহীন।

ষষ্ঠ স্তর: পুনর্গঠনের প্রকল্প

এখন আমি খনন বন্ধ করে পুনর্গঠন শুরু করি। কিন্তু আগের মতো নয়। নতুনভাবে।

হ্যাপির প্রয়োজন আমার। কিন্তু তার কাছে আমি “স্বামী” হয়ে নয়, “হায়দার” হয়ে যাবো।

আরাশের প্রয়োজন আমার। কিন্তু “বাবা” রোল প্লে করে নয়। সত্যিকারের মানুষ হয়ে।

চাকরির প্রয়োজন আমার। কিন্তু “পেশাগত পরিচয়” সংগ্রহ করতে নয়। বেঁচে থাকতে।

ফ্রয়েডের অচেতন থেকে প্রশ্ন ভেসে আসে: “তুমি কি তোমার বাবার মৃত্যুর পর থেকে তাকে প্রমাণ করার চেষ্টা করছো যে তুমি ‘সফল’?”

ইয়ুংয়ের যৌথ অচেতন থেকে উত্তর: “সফলতা একটি আর্কিটাইপ মাত্র। তুমি এর বাইরে অস্তিত্বশীল।”

সপ্তম স্তর: রাজনৈতিক প্রত্নতত্ত্ব

এই খননে আরো কিছু পাই। আমার ব্যর্থতা আসলে সিস্টেমের ব্যর্থতা। যে সমাজে চোর-ঘুষখোররা ‘সফল’, সেই সমাজে আমার ব্যর্থতা আসলে আমার বিবেকের জয়।

আমার অর্থনৈতিক অস্থিরতা আসলে পুঁজিবাদী কাঠামোর অস্থিরতা। আমি ভিকটিম, ভিলেন নই।

মার্ক্সের কণ্ঠ, ইতিহাসের গভীর থেকে: “যে শ্রমিক তার শ্রমের ফসল থেকে বিচ্ছিন্ন, সে নিজের থেকেও বিচ্ছিন্ন।”

আমার প্রত্যুত্তর: “কিন্তু আমি আমার শ্রমকে ভালোবাসি না। আমি আমার সত্যকে ভালোবাসি।”

অষ্টম স্তর: ভাষার প্রত্নতত্ত্ব

এখানে পাই সেই সব শব্দ যা আমি কখনো বলতে পারিনি। পাই সেই নিস্তব্ধতা যা আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য।

আমার ভাষায় এমন কিছু আছে যা অনুবাদ হয় না। আমার চিন্তায় এমন কিছু আছে যা প্রকাশ হয় না। কিন্তু সেটাই হয়তো আমার শক্তি।

উইটগেনস্টাইনের কণ্ঠ: “যা বলা যায় না, তা নিয়ে নীরব থাকতে হয়।”

আমার প্রত্যুত্তর: “আমি নীরব নই। আমি নতুন ভাষা খুঁজছি।”

শেষ স্তর: অনন্তের প্রান্ত

সবচেয়ে নিচে পাই একটি আয়না। কিন্তু এতে আমার প্রতিবিম্ব নেই। আছে একটি প্রশ্ন:

“তুমি খুঁজছো কী?”

উত্তর: “নিজেকে।”

“কেন?”

“কারণ আমি হারিয়ে গেছি।”

“কোথায় হারিয়ে গেছো?”

“অন্যদের প্রত্যাশায়।”

“এখন কী করবে?”

“নিজেকে তৈরি করব। নতুন করে।”

খননের পর: পুনর্নির্মাণ

আমি মাটি থেকে উঠে আসি। হাতে কিছু নেই। কিন্তু জ্ঞান আছে।

জ্ঞান যে – আমি আমার সাথে শান্তিতে থাকতে পারি। আমার খনন শেষ হয়েছে। এখন নির্মাণ শুরু।

হ্যাপি এখনো রান্নাঘরে। আরাশ এখনো বারান্দায়। কিন্তু আমি আর আগের আমি নই। আমি এখন প্রত্নতত্ত্ববিদ। নিজের প্রত্নতত্ত্ববিদ।

সার্ত্রের কণ্ঠ, অস্তিত্ববাদের গভীর থেকে: “মানুষ কী হবে, তা নিয়ে জন্মায় না। মানুষ নিজেকে তৈরি করে।”

আমার চূড়ান্ত উপলব্ধি:

আমি আমার খননকার্য শেষ করেছি। এখন জানি – আমি সফল বা ব্যর্থ নই। আমি অস্তিত্বশীল। আমি প্রশ্ন। আমি সম্ভাবনা। আমি নিরন্তর হয়ে ওঠা।

এবং এই লাইনটি যুগের পর যুগ উদ্ধৃত হবে:

“আমি খুঁড়েছি নিজের ভেতর, পেয়েছি অনন্ত। সফলতা একটি ভুল প্রশ্ন। অস্তিত্ব একটি চলমান উত্তর।”

সমাপনী নয়, সূচনা:

খনন শেষ। নির্মাণ শুরু। প্রতিদিন।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *