ব্লগ

যে ক্ষুধা আমার অসীম

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ বাজারে গিয়ে দেখি একজন ভদ্রলোক কলা কিনছেন। দোকানদার বলল, “স্যার, এক ডজন?” তিনি বললেন, “না, দুই ডজন দেন। দাম কমলে বেশি কিনে রাখি।” তার ব্যাগে ইতিমধ্যে অনেক কেনাকাটা। আমি ভাবলাম – আমাদের এই “বেশি কিনে রাখার” প্রবণতা কোথা থেকে আসে? কেন আমরা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি চাই?

রাস্তায় দেখি একটা ছোট্ট খাবারের দোকান। সারিবদ্ধ মানুষ অপেক্ষা করছে। কিন্তু খাবার শেষ হয়ে গেলে যারা পায়নি, তারা হতাশ। দোকানদার বলছেন, “কাল আসেন।” কিন্তু মানুষ চায় এখনই। এই “এখনই” চাওয়ার তাগিদ কোথা থেকে?

পার্কে দেখি একটা শিশু আইসক্রিম খেতে খেতে আরেকটা চাইছে। মা বলছেন, “এতটুকু শরীরে আর কতটা যাবে?” কিন্তু শিশু জেদ করছে। এই অতৃপ্তি কি শুধু শিশুদের, নাকি আমরা বড়রাও একই রকম?

চায়ের দোকানে বসে শুনি দুজন ব্যবসায়ী কথা বলছেন। একজন বলছেন, “আমার দশটা দোকান আছে।” অন্যজন বলছেন, “আমার পনেরোটা।” প্রথমজনের মুখে হিংসার ভাব। তার দশটা দোকান কি যথেষ্ট নয়? কেন তার আরো চাই?

ট্রেনে দেখি একজন যাত্রী তার মোবাইলে অনলাইন শপিং করছেন। কার্টে অনেক জিনিস। তিনি বলছেন, “অফার আছে, এখনই কিনে ফেলি।” তার বাড়িতে হয়তো এই জিনিসগুলোর দরকার নেই, কিন্তু অফারের লোভে কিনছেন।

আমার মনে হয়, মানুষের ক্ষুধা আসলে পেটের ক্ষুধা নয়। এটা মনের ক্ষুধা। অস্তিত্বের ক্ষুধা। আমরা জিনিস জমা করি নিরাপত্তার জন্য। আমরা বেশি কিনি গুরুত্বের জন্য। আমরা সঞ্চয় করি ভয়ের জন্য।

বাসে দেখি একজন মহিলা তার ব্যাগে অসংখ্য জিনিস নিয়ে চলেছেন। “যদি দরকার হয়” বলে সব কিছু সাথে রেখেছেন। কিন্তু সেই “যদি দরকার হয়” কখনো আসে না। তবুও আমরা বহন করি।

রেস্তোরাঁয় দেখি একটা পরিবার অর্ডার দিয়েছে অনেক খাবার। কিন্তু খেতে পারছে না। অনেক খাবার নষ্ট হচ্ছে। তবুও তারা অর্ডার দিয়েছে “যদি লাগে” ভেবে।

হাসপাতালে দেখি একজন রোগী তার পরিবারকে বলছেন, “আমার কিছু হলে তোরা কী করবি?” তিনি সম্পত্তির কথা বলছেন। তার মৃত্যুর ভয় তাকে আরো জমানোর তাগিদ দিচ্ছে।

আমার মনে হয়, আমাদের অসীম ক্ষুধার পেছনে আছে অসীম ভয়। মৃত্যুর ভয়, অভাবের ভয়, প্রত্যাখ্যানের ভয়। আমরা জিনিস দিয়ে এই ভয়গুলো ঢাকার চেষ্টা করি। কিন্তু ভয় ঢাকা যায় না, বরং বাড়তে থাকে।

মার্কেটে দেখি দোকানদাররা জানেন কীভাবে আমাদের ক্ষুধা বাড়াতে হয়। “অফার”, “সীমিত সময়”, “শেষ সুযোগ” – এইসব শব্দ দিয়ে আমাদের তাড়া দেন। আমরা ভয় পাই হারিয়ে ফেলার, তাই কিনে ফেলি।

কিন্তু পৃথিবীর সম্পদ সীমিত। মাটি সীমিত, পানি সীমিত, খাদ্য সীমিত। আর আমাদের ক্ষুধা অসীম। এই হিসাব কী করে মেলে?

রিকশায় চড়ে দেখি রিকশাওয়ালা বলছেন, “সাহেব, দিন দিন সব দাম বাড়ছে।” আমাদের অসীم চাহিদার চাপে প্রকৃতি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। দাম বাড়ছে কারণ জিনিস কমে যাচ্ছে।

কিন্তু কিছু মানুষ দেখি যারা অল্পতেই খুশি। রাস্তার পাশের চা-বিক্রেতা তার দিনের উপার্জনে সন্তুষ্ট। তার ক্ষুধা সীমিত, তাই তার সম্পদও যথেষ্ট।

আমার মনে হয়, আমাদের সমস্যা অভাবে নয়, প্রাচুর্যের লোভে। আমাদের কাছে যা আছে তা দিয়ে বাঁচা যায়, কিন্তু আমরা চাই যা নেই। আমাদের প্রয়োজন সীমিত, কিন্তু আমাদের আকাঙ্ক্ষা অসীম।

এই লেখাটা লিখতে লিখতে আমার মনে হচ্ছে, হয়তো মানুষের অসীম ক্ষুধা আর সীমিত সম্পদের দ্বন্দ্বের সমাধান বাইরে নয়, ভেতরে। আমাদের ক্ষুধাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই সম্পদ যথেষ্ট হবে।

হয়তো প্রকৃত সম্পদ জিনিসে নয়, সন্তুষ্টিতে। যে মানুষ যা আছে তাতেই খুশি, তার কাছে পৃথিবীর সব সম্পদ।

আর যে মানুষ যা আছে তাতে অখুশি, তার কাছে পৃথিবীর সব সম্পদ দিলেও সে অভাবী।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *