আজ রাতে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত ২টা ৩০ মিনিট। হাতে ফোন। স্ক্রিনে একটা হেডলাইন – “এই ১০টি খাবার খেলে আয়ু ২০ বছর বাড়বে!” ক্লিক করে দেখি আরেকটা হেডলাইন – “যে কারণে ৯৯% মানুষ ব্যর্থ হয়!” আবার ক্লিক। তারপর “শক! এই তারকার গোপন জীবন!” আরেক ক্লিক।
আমার মস্তিষ্ক যেন একটা ক্ষুধার্ত প্রাণী হয়ে গেছে। প্রতিটা ক্লিকবেইট একটা টোপ, আর আমি সেই টোপে কামড়াতে থাকি। জানি যে এগুলো ফাঁকা, তবুও থামতে পারি না।
সকালে আরাশকে দেখি সে একটা ভিডিও বানাচ্ছে। টাইটেল দেখে আমি চমকে গেলাম – “Amazing Street Art You’ve Never Seen!”
“তুই তো ক্লিকবেইট টাইটেল দিয়েছিস!”
সে থেমে বলল, “বাবা, কিন্তু আমার ভিডিওতে সত্যিই amazing স্ট্রিট আর্ট আছে। আমি কিছু লুকাইনি।”
“তাহলে এই টাইটেল দিলি কেন?”
“কারণ ভালো টাইটেল না দিলে কেউ দেখে না। আর কেউ না দেখলে আমার কাজ মানুষের কাছে পৌঁছায় না।”
আমার ভিতরে একটা অ্যাপ আপগ্রেড হলো। নাম বদলে গেল “সরলীকরণ ভার্সন ২.০” থেকে “জটিলতার স্বীকৃতি ভার্সন ১.০”।
অফিসে জামিউরের সাথে এই নিয়ে কথা বলছিলাম। সে বলল, “হায়দার ভাই, আপনি যে ক্লিকবেইটে আটকান, সেটা কি আসলেই সমস্যা?”
“মানে?”
“মানে, আপনি তো আগ্রহী বলেই ক্লিক করেন। কৌতূহল থাকার তো দোষ নেই।”
“কিন্তু পরে দেখি কিছুই নেই।”
“হয়তো সেটাও একটা শিক্ষা। আপনি শিখছেন কোনটা সত্যি, কোনটা মিথ্যা।”
রাতে হ্যাপির সাথে এই আলোচনা করছিলাম। সে বলল, “হায়দার, তুমি যখন ক্লিকবেইটে আটকে থাকো, আমি লক্ষ করি তোমার চোখে একটা অন্যমনস্ক ভাব থাকে।”
“কেমন ভাব?”
“মনে হয় তুমি কিছু খুঁজছ, কিন্তু জানো না কী খুঁজছ। যেন তোমার মন ক্ষুধার্ত, কিন্তু কিসের ক্ষুধা সেটা বুঝতে পারছ না।”
হ্যাপির কথায় আমি ভেবে দেখলাম। আমি কী খুঁজি এই ক্লিকবেইটগুলোতে? হয়তো এমন কোনো তথ্য যা আমার জীবন বদলে দেবে। হয়তো এমন কোনো গল্প যা আমার একাকীত্ব ভুলিয়ে দেবে। হয়তো এমন কোনো আশা যা আমার ব্যর্থতার কষ্ট কমাবে।
কিন্তু যা পাই তা হলো আরও প্রশ্ন, আরও কৌতূহল, আরও ক্লিক।
পরদিন একটা পরীক্ষা করলাম। একটা ক্লিকবেইট হেডলাইন দেখে ক্লিক করার আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম – “আমি এখানে কী পেতে চাই?”
উত্তর এলো – “আমি চাই জানতে যে আমার জীবনে আরও কোনো সম্ভাবনা আছে।”
তারপর ক্লিক করলাম। ভেতরে ঢুকে দেখি একটা সাধারণ তালিকা। কিন্তু এবার হতাশ হলাম না। কারণ আমি জানতাম আমি কী খুঁজছিলাম।
আরাশের ঘরে গিয়ে দেখি সে একটা ড্রয়িং করছে। একটা মাকড়সার জাল। কিন্তু জালের মাঝে আটকে আছে একটা প্রজাপতি নয়, একটা মাকড়সা।
“এটা কী বোঝাচ্ছে?”
“বাবা, মাকড়সা জাল বুনেছে পোকা ধরার জন্য। কিন্তু সে নিজেই জালে আটকে গেছে।”
“ক্লিকবেইটের মতো?”
“হ্যাঁ। আমরা অন্যদের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য এইসব বানাই। কিন্তু শেষে আমরা নিজেরাই এর দাস হয়ে যাই।”
রাতে নামাজ পড়ে ভাবছিলাম, আল্লাহ আমাদের কৌতূহল দিয়েছেন জ্ঞান অর্জনের জন্য। কিন্তু আমরা সেই কৌতূহল ব্যবহার করছি ফালতু জিনিসের পেছনে দৌড়ানোর জন্য।
আমার বাবা বলতেন, “যা প্রয়োজন তা খোঁজো, যা চাও তা নয়।” ক্লিকবেইট আমাদের “চাওয়া” বাড়ায়, “প্রয়োজন” মেটায় না।
কিন্তু এর মানে এই নয় যে সব ক্লিকবেইট খারাপ। আরাশের মতো যদি কেউ সত্যিকারের ভালো কাজের জন্য আকর্ষণীয় টাইটেল ব্যবহার করে, সেটা তো দোষের নয়।
আসল সমস্যা আমাদের মনের ক্ষুধার মধ্যে। আমরা চাই তাৎক্ষণিক সন্তুষ্টি। আমরা চাই সহজ সমাধান। আমরা চাই বিনা পরিশ্রমে সাফল্য।
ক্লিকবেইট সেই “চাওয়া”র সুযোগ নেয়।
তাহলে মুক্তির উপায়? হয়তো নিজের ক্ষুধার প্রকৃতি বুঝতে হবে। আমি কী খুঁজি? আমার আসল প্রয়োজন কী?
আর সবচেয়ে বড় কথা, ধৈর্য রাখতে হবে। জীবনের আসল উত্তরগুলো ক্লিক করে পাওয়া যায় না। সেগুলো অভিজ্ঞতা করে, কষ্ট করে, সময় দিয়ে পেতে হয়।
ক্ষুধার্ত চোখ দিয়ে তাকিয়ে থাকলে শুধু মরীচিকা দেখা যায়। চোখ বন্ধ করে ভিতরে তাকালে আসল সত্য মেলে।
একটু ভাবনা রেখে যান