ব্লগ

অফিসের “কী খবর?” এর অটোমেটিক “ভালো”

নভেম্বর ২০২৫ · 3 মিনিটে পড়া
শেয়ার

সকালে অফিসে ঢুকেই দেখা জামিউরের সাথে। “কী খবর?” সে জিজ্ঞেস করে। আমার মুখ থেকে অটোমেটিক বেরিয়ে আসে, “ভালো।” কথাটা বলার সাথে সাথেই মনে হয় এটা যেন একটা প্রোগ্রাম করা রেসপন্স। যেন আমার মস্তিষ্কে একটা বোতাম আছে যেটা চাপলেই “ভালো” শব্দটা বেরিয়ে আসে।

কিন্তু সত্যিই কি সব ভালো? গতকাল রাতে আরাশের পরীক্ষার রেজাল্ট নিয়ে চিন্তা করে ঘুম আসেনি। সকালে উঠে হ্যাপির সাথে বাজেট নিয়ে একটা ছোট্ট তর্ক হয়েছে। বাসে আসার সময় ট্রাফিক জ্যামে আটকে রাগ হয়েছে। এসব কিছুর পরেও মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে “ভালো।”

এই অটোমেটিক উত্তরের পেছনে কী আছে? কেন আমরা সত্যি বলি না? কেন বলি না, “আসলে একটু খারাপ” বা “ভালো না”?

হয়তো অফিসের পরিবেশে আমরা একটা মাস্ক পরে থাকি। সেখানে ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে কথা বলা অনুচিত। তাই সবসময় “ভালো” বলাই নিরাপদ।

কিন্তু এই “ভালো” বলার পর জামিউরও বলে, “ভালো।” তারপর আমরা দুজনেই নিজ নিজ ডেস্কে চলে যাই। একটা অর্থহীন কথোপকথনের সমাপ্তি।

আল্লাহর কাছে প্রশ্ন করি, “কেন আমরা এমন প্রশ্ন করি যার উত্তর আমরা শুনতে চাই না? আর কেন এমন উত্তর দিই যা সত্যি নয়?”

দুপুরে আরেক সহকর্মী এসে বলে, “কী খবর?” আমি আবার বলি, “ভালো।” কিন্তু এবার নিজেই অবাক হই। এত মেশিনের মতো কেন উত্তর দিচ্ছি?

একবার পরীক্ষা করে দেখেছিলাম। কেউ “কী খবর?” জিজ্ঞেস করলে বলেছিলাম, “আসলে একটু সমস্যায় আছি।” সেই ব্যক্তি একটু অস্বস্তিতে পড়েছে। বলেছে, “ও, আচ্ছা।” তারপর দ্রুত চলে গেছে।

বুঝলাম অফিসে “কী খবর?” এর সত্যিকারের উত্তর কেউ চায় না। এটা শুধু একটা সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা।

আরাশ একদিন বলেছিল, “আব্বু, আপনি অফিসে গিয়ে মিথ্যা বলেন কেন?” আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “কখন?” সে বলেছিল, “আপনি তো সবসময় বলেন সব ভালো। কিন্তু বাড়িতে এসে অনেক কিছুর অভিযোগ করেন।”

তার এই নিষ্পাপ পর্যবেক্ষণে আমি হতবাক। সত্যিই তো, আমি দুই রকম চরিত্র নিয়ে বাঁচি।

হ্যাপি বলে, “এটা তো সবাই করে। অফিসে নিজের ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে কথা বলা ঠিক না।” কিন্তু তাহলে এই প্রশ্ন করার মানে কী?

এই “ভালো” বলার অভ্যাসটা এতটাই গেঁথে গেছে যে কখনো কখনো নিজের পরিবারের সাথেও এমন হয়। আরাশ জিজ্ঞেস করে, “আব্বু, কেমন লাগছে?” আমি বলি, “ভালো।” অথচ মন খারাপ থাকতে পারে।

অফিসে আমাদের সবার মুখে এই একই উত্তর। “ভালো।” যেন আমরা সবাই একটা কোম্পানির রোবট। একই প্রোগ্রাম দিয়ে চালিত।

কিন্তু মাঝে মাঝে ভাবি, এই রোবটিক উত্তর না দিলে কী হত? যদি আমি সত্যি বলতাম আমার মন কেমন আছে?

হয়তো তাহলে অফিসে আরো মানবিক সম্পর্ক গড়ে উঠত। হয়তো আমরা একে অপরকে আরো ভালোভাবে বুঝতে পারতাম।

কিন্তু এই ঝুঁকি নিতে সাহস হয় না। কারণ জানি যে অন্যরা এই সত্যি শুনতে প্রস্তুত নয়।

তাই চালিয়ে যাই এই অটোমেটিক “ভালো” বলার খেলা। আর প্রতিদিন একটু বেশি মেশিনের মতো হয়ে উঠি।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *