অফিসে বসে ইমেইল লিখছি। “আশা করি আপনি ভালো আছেন। আপনার প্রোজেক্ট সম্পর্কে জানতে চাই।” সাদামাটা ভাষা। কোনো রং নেই। কোনো সুর নেই।
কিন্তু মনে পড়ে গেল রবীন্দ্রনাথের লাইন—”আমি কান পেতে রই।” তিনি চিঠি লিখতে পারতেন—”আশা করি ভালো আছেন।” কিন্তু লিখলেন—”আমি কান পেতে রই।” একই অর্থ, আকাশ পাতাল পার্থক্য।
কবিতার ভাষা আর দৈনন্দিন ভাষা দুই জগতের।
আরাশকে বলি, “ভালো হয়ে থাকো।” কিন্তু যদি বলতাম—”তুমি হয়ে উঠো আকাশের মতো বিশাল, সূর্যের মতো উজ্জ্বল।” একই উপদেশ, কিন্তু কবিতার মোড়কে। তাহলে আরাশ কি বেশি মনে রাখত?
দৈনন্দিন ভাষা তথ্য দেয়। কবিতার ভাষা অনুভব দেয়।
স্ত্রীকে বলি, “তোমাকে ভালোবাসি।” সহজ। স্পষ্ট। কিন্তু কবি বলেন—”তোমায় পাওয়ার জন্য হে স্বাধীন, আমি রাজার সাজে সাজাবো না।” একই আবেগ, কিন্তু কত গভীরতা।
আমরা কেন কবিতার ভাষা ব্যবহার করি না? কারণ সময় নেই? নাকি সাহস নেই?
কবিতার ভাষা বিপজ্জনক। কারণ সেটা অন্তরের গভীরে পৌঁছায়। মানুষকে ভাবতে বাধ্য করে। অনুভব করাতে বাধ্য করে।
অফিসের কলিগদের সাথে কথা বলি ব্যবসায়িক ভাষায়। “টার্গেট,” “পারফরমেন্স,” “ডেডলাইন।” কিন্তু এই শব্দগুলো জানের কথা বলে না। প্রাণের কথা বলে না।
কবিতার ভাষা প্রাণের ভাষা।
কিন্তু বাস্তব জীবনে কবিতার ভাষা অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। “রুটি কিনে আনো” বললে কাজ হয়। “জীবনের খাদ্য সংগ্রহ করো” বললে মানুষ হাসবে।
তাহলে কি কবিতার ভাষা শুধু বইয়ের জন্য? জীবনের জন্য নয়?
না। কিছু মুহূর্তে আমরা সবাই কবিতার ভাষা ব্যবহার করি। প্রেমে পড়লে। দুঃখে ভাঙলে। মৃত্যুর সামনে দাঁড়ালে।
বাবা মারা যাওয়ার সময় বলেছিলাম, “আপনি আমার আকাশ ছিলেন।” “আপনি আমার বাবা ছিলেন” না বলে। কেন? কারণ সেই মুহূর্তে দৈনন্দিন ভাষা যথেষ্ট ছিল না।
গভীর আবেগের মুহূর্তে আমরা প্রাকৃতিকভাবে কবিতার ভাষার দিকে ঝুঁকি।
কিন্তু বাকি সময়? কেন আমরা কবিতার ভাষা এড়িয়ে চলি?
হয়তো কারণ কবিতার ভাষা সময় চায়। ভাবনা চায়। আর আমাদের যুগ দ্রুততার যুগ।
হয়তো কারণ কবিতার ভাষা ব্যাখ্যার দাবি করে। আর আমরা চাই সরল যোগাযোগ।
হয়তো কারণ কবিতার ভাষা ঝুঁকিপূর্ণ। ভুল বোঝার সম্ভাবনা।
কিন্তু এই এড়ানোর মূল্য কী? আমরা কি ভাষার সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলছি?
মোবাইল ম্যাসেজে লিখি—”কাজ কেমন চলছে?” কিন্তু লিখতে পারতাম—”তোমার স্বপ্নগুলো কেমন এগিয়ে চলেছে?” একই প্রশ্ন, ভিন্ন মাত্রা।
সমস্যা হচ্ছে—আমরা ভেবেছি কবিতার ভাষা অবাস্তব। কিন্তু আসলে দৈনন্দিন ভাষাই অসম্পূর্ণ।
কবিতার ভাষা জীবনকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারে। প্রতিদিনের ছোট মুহূর্তগুলোকে বিশেষ করতে পারে।
কিন্তু সেই সাহস কজনের আছে?
হয়তো কবিতার ভাষা একটা বিলুপ্তপ্রায় শিল্প। শুধু বই আর মঞ্চের জন্য।
নাকি আমরা ফিরিয়ে আনতে পারি দৈনন্দিন জীবনে?
একটু ভাবনা রেখে যান