চিঠি লিখতে বসি। “প্রিয় বন্ধু, আশা করি তুমি ভালো আছো।” হাতের লেখায় আমার ব্যক্তিত্ব ভিন্ন। ধীর, চিন্তাশীল, পরিমিত। কিন্তু একই কথা মুখে বললে—”এই যে, কেমন আছিস?” দ্রুত, স্বাভাবিক, আবেগপ্রবণ।
লেখার আমি আর বলার আমি দুই জন।
অফিসে ইমেইল লিখি। “I would like to inform you that…” কিন্তু কলিগের সাথে কথা বলি—”দেখো, ব্যাপারটা হচ্ছে…” লিখিত ভাষা আনুষ্ঠানিক, কথ্য ভাষা সহজ।
লেখায় আমি সময় পাই ভাবতে। শব্দ বেছে নিতে। বাক্য সাজাতে। কিন্তু কথায় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। যা মনে আসে, তাই বলি।
লেখার ব্যক্তিত্ব পরিকল্পিত। বলার ব্যক্তিত্ব স্বতঃস্ফূর্ত।
ডায়েরিতে লিখি—”আজ মন খুব খারাপ। জীবনে কোনো অর্থ খুঁজে পাচ্ছি না।” কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস করলে বলি—”ভালো আছি।” লেখায় সততা, কথায় সামাজিকতা।
লেখা আমার একান্ত জগৎ। কথা আমার সামাজিক জগৎ।
প্রেমের চিঠি লিখতাম—”তোমার প্রেমে আমার হৃদয় মুখরিত।” কিন্তু মুখে বলি—”তোকে ভালোবাসি।” লেখায় কবিতা, কথায় গদ্য।
কেন এই পার্থক্য?
লেখার সময় আমি একা। কোনো প্রতিক্রিয়ার চাপ নেই। কোনো বিচার নেই। নিজের মতো করে প্রকাশ করতে পারি।
কিন্তু কথা বলার সময় সামনে মানুষ। তার প্রতিক্রিয়া দেখি। তার মুখভাব পড়ি। তার মতো করে কথা বলার চাপ থাকে।
লেখায় আমি নিজের জন্য লিখি। কথায় অন্যের জন্য বলি।
মোবাইলে মেসেজ লিখি—”Ok. Thanks.” কিন্তু ফোনে বলি—”হ্যাঁ বুঝেছি। ধন্যবাদ। আর কিছু লাগবে?” কথায় বেশি আবেগ, বেশি সৌজন্য।
আজকের যুগে হোয়াটসঅ্যাপ, ইমেইল, চ্যাট—লিখিত যোগাযোগ বেড়েছে। কিন্তু সেই লেখা কি আসল লেখা? নাকি কথার লিখিত রূপ?
“হাহাহা” লিখি। কিন্তু আসলে হাসিনি। “😢” দিই। কিন্তু কাঁদিনি। ডিজিটাল লেখা আবেগের নকল।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার—কলমে লিখলে একরকম ব্যক্তিত্ব, টাইপ করলে অন্যরকম। কলমের গতি ধীর, তাই চিন্তার সময় বেশি। কিবোর্ডের গতি দ্রুত, তাই কথার মতো।
হস্তাক্ষর দেখে মানুষের চরিত্র বোঝা যায়। কিন্তু টাইপিং দেখে কী বোঝা যায়? ফন্ট সবার একই।
চিঠির যুগে প্রেম ছিল লিখিত। এখন ভালোবাসা কথায়। হয়তো এজন্য আগের প্রেম বেশি গভীর ছিল।
কবিরা লেখেন। বক্তারা বলেন। দুটোই শিল্প, কিন্তু ভিন্ন মাধ্যম।
আমি যখন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিই, লিখে নিই। মুখে বললে ভুলে যাই। লেখা স্থায়ী, কথা ক্ষণস্থায়ী।
কিন্তু কথার তাৎক্ষণিকতা আছে। লেখার গভীরতা আছে।
দুটোর যদি সমন্বয় করা যায়? লিখিত ভাষার চিন্তাশীলতা আর কথ্য ভাষার জীবন্ততা?
হয়তো সেই মানুষই সম্পূর্ণ, যে লিখতেও পারে, বলতেও পারে।
আমার দুই ব্যক্তিত্ব—কলমের আর কথার। দুটোই আমি, কিন্তু ভিন্ন মুখ।
কোনটা বেশি সত্য? লিখিত আমি নাকি কথিত আমি?
হয়তো দুটো মিলেই পূর্ণ আমি।
একটু ভাবনা রেখে যান