ব্লগ

যে চক্র আমার কারাগার

নভেম্বর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ সকালে হ্যাপির সাথে একটা ছোট তর্ক হয়েছিল। সে বলেছিল আমি কাল রাতে তার কথা মন দিয়ে শুনিনি। আমি রেগে গিয়ে বলেছিলাম, “তুমি সবসময় অভিযোগ কর।” তার মুখ খারাপ হয়ে গেল। ফলে আমার দিনটা শুরু হল অপরাধবোধ নিয়ে। অফিসে গিয়ে সহকর্মীদের সাথে কড়া ব্যবহার করলাম। তারা বিরক্ত হল। ফলে কাজের পরিবেশ খারাপ হল। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আরাশের সাথে ধৈর্য হারালাম। এই যে একটা কর্ম থেকে আরেকটা কর্ম, একটা ফল থেকে আরেকটা বীজ – এটা কি একটা অন্তহীন চক্র?

কিছুদিন আগে বাসে একজন বৃদ্ধকে সিট ছেড়ে দিয়েছিলাম। তিনি কৃতজ্ঞতায় দোয়া করেছিলেন। সেই দোয়া শুনে আমার মন ভালো হয়েছিল। ভালো মুডে অফিসে গিয়ে সবার সাথে ভালো আচরণ করেছি। ফলে কাজের পরিবেশ উন্নত হয়েছিল। সন্ধ্যায় খুশি মনে বাড়ি ফিরে পরিবারের সাথে ভালো সময় কাটিয়েছি। একটা ছোট ভালো কাজ কীভাবে একটা ভালো দিন তৈরি করল!

রাস্তায় দেখি একজন রিকশাওয়ালা একটা গাড়ির সাথে ধাক্কা খেয়ে রেগে গিয়েছেন। তিনি চিৎকার করছেন। গাড়ির চালক পাল্টা রেগে গেছে। দুজনের ঝগড়া দেখে ট্রাফিক জ্যাম হয়েছে। সবাই বিরক্ত হয়েছে। একটা মুহূর্তের রাগ কত মানুষের দিন খারাপ করে দিল!

চায়ের দোকানে বসে দেখি দোকানদার একজন গরিব মানুষকে বিনা পয়সায় চা দিয়েছেন। সেই মানুষটি কৃতজ্ঞ হয়ে অন্য ক্রেতাদের কাছে দোকানদারের প্রশংসা করছে। ফলে আরো ক্রেতা এসেছে। দোকানদারের দানশীলতা তার ব্যবসার জন্যও ভালো হয়েছে।

মার্কেটে দেখি একজন বিক্রেতা একজন ক্রেতাকে ঠকানোর চেষ্টা করছেন। ক্রেতা বুঝে গিয়ে রেগে গেছে। সে তার বন্ধুদের বলেছে এই দোকানে না যেতে। ফলে দোকানদারের সুনাম নষ্ট হয়েছে। একটা অসৎ কাজ তার নিজের উপরই ফিরে এসেছে।

জামিউর একবার আমাকে বলেছিল, “ভাই, আমি ভালো কাজ করি কিন্তু ভালো ফল পাই না।” আমি তাকে বলেছিলাম, “হয়তো ফল এখনো আসেনি।” কিন্তু আসলেই কি সব কর্মের ফল আসে? নাকি আমরা যেটাকে “ফল” বলি সেটা শুধু আমাদের ব্যাখ্যা?

সাইফুল কবির একদিন বলেছিল, “আমি মন্দ কাজ করিনি, তবুও কষ্ট পাচ্ছি।” কিন্তু তার কষ্ট কি তার কর্মের ফল? নাকি জীবনের স্বাভাবিক উত্থান-পতন? আমরা কি সবকিছুতে কারণ-ফল খুঁজে বেড়াই?

মৃদুল কানাডায় গিয়ে সফল হয়েছে। সে মনে করে এটা তার কঠিন পরিশ্রমের ফল। কিন্তু যে তরুণ একই পরিশ্রম করেও ব্যর্থ হয়েছে, তার কী দোষ? কর্মফল তত্ত্ব কি সবসময় কাজ করে?

আমার মনে হয়, আমরা একটা জটিল জালে আবদ্ধ যেখানে আমাদের প্রতিটা কাজ অসংখ্য প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কিন্তু এই প্রতিক্রিয়াগুলো এত জটিল যে আমরা সবসময় বুঝতে পারি না কোনটা কোন কাজের ফল।

হাসপাতালে দেখি একজন ডাক্তার রোগীর সেবায় নিবেদিত। তার ভালো কাজের ফল কি তার সুনাম? নাকি তার অন্তরের শান্তি? নাকি রোগীর সুস্থতা? নাকি সবগুলোই?

পার্কে দেখি একটা শিশু একটা পিঁপড়েকে পা দিয়ে মারল। তার মা তাকে বকল। শিশুটি কাঁদল। এই ছোট হিংসার ফল কি তাৎক্ষণিক কান্না? নাকি তার ভবিষ্যত চরিত্রে কোনো প্রভাব? নাকি কিছুই না?

আমার নিজের জীবনে দেখি – বাবার মৃত্যুর পর আমি দায়িত্বশীল হয়েছি। এটা কি আমার পূর্ব কর্মের ফল? নাকি স্রেফ পরিস্থিতির চাপ? আমার দায়িত্বশীলতা কি আরাশের ভবিষ্যতে প্রভাব ফেলবে? নাকি সে তার নিজের পথ তৈরি করবে?

আরাশকে যখন ভালো আচরণ শেখাই, আমি আশা করি সে ভালো মানুষ হবে। কিন্তু তার ভবিষ্যত কি আমার শেখানোর ফল? নাকি তার নিজস্ব পছন্দের ফল? কর্মফলের এই চক্রে আমার নিয়ন্ত্রণ কতটুকু?

নামাজ পড়ার সময় আমি ভালো কাজের আশা করি। কিন্তু আমি কি ভালো কাজ করি সওয়াবের জন্য? নাকি সওয়াবের জন্য করলে সেটা কি সত্যিকারের ভালো কাজ? এই যে ফলের আশা নিয়ে কাজ করা – এটা কি আমাকে কর্মচক্রে আরো বেশি আবদ্ধ করে?

ট্রেনে দেখি একজন ব্যবসায়ী ফোনে বলছেন, “যা বুনবে তাই কাটবে।” কিন্তু যা কাটছে সেটা কি সত্যিই তার বোনা? নাকি অন্য কারো বোনা? নাকি প্রকৃতির নিজস্ব ফসল?

আমার মনে হয়, কর্মফল চক্র হয়তো আমাদের নৈতিকতার একটা কাঠামো। এটা আমাদের বলে ভালো কাজ কর, মন্দ কাজ করো না। কিন্তু বাস্তবে জীবন এত জটিল যে কোনটা কোন কাজের ফল তা বোঝা অসম্ভব।

হয়তো আসল প্রশ্ন এটা নয় যে আমি কর্মফলের চক্রে আবদ্ধ কিনা। আসল প্রশ্ন হলো আমি কীভাবে এই অনিশ্চয়তার সাথে বাস করব। কীভাবে ফলের আশা না করে ভালো কাজ করব।

এই লেখাটা লিখতে লিখতে আমার মনে হচ্ছে, কর্মফল চক্র হয়তো একটা কারাগার নয়, বরং একটা নাচ। যেখানে আমি নিশ্চিত নই কোন পদক্ষেপ কোন ছন্দে নিয়ে যাবে। কিন্তু আমি নাচতে পারি সৌন্দর্যের জন্য, ফলাফলের জন্য নয়।

হয়তো মুক্তি এখানেই – কাজ করা, কিন্তু ফলের প্রতি আসক্ত না থাকা। বোঝা যে আমি একটা বিশাল জটিল সিস্টেমের ছোট অংশ। আর সেই বোঝাপড়া নিয়েই যথাসাধ্য ভালো কাজ করে যাওয়া।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *