ব্লগ

যে ব্যথা আমার শিক্ষক

নভেম্বর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া
শেয়ার

বাবা মারা যাওয়ার রাতে আমি রান্নাঘরে বসে কাঁদছিলাম। হ্যাপি এসে আমার পাশে বসল, কিছু বলল না। শুধু আমার হাত ধরে রইল। সেই নীরবতার মধ্যে আমি প্রথম বুঝেছিলাম যে কষ্ট একা সহ্য করার জিনিস নয়। কষ্ট একটা ভাষা, যেটা কথা ছাড়াই বলা যায়, শোনা যায়।

সেই রাতে আমি আরো বুঝেছিলাম যে ব্যথা একটা শিক্ষক। নিষ্ঠুর, কিন্তু কার্যকর।

গত বছর যখন আমার চাকরি হারানোর আশঙ্কা ছিল, আমি প্রতিরাত জেগে থাকতাম। আরাশ একদিন বলেছিল, “বাবা, তুমি এত চিন্তা কেন কর?” আমি তাকে বোঝাতে পারিনি যে এই চিন্তা, এই অনিশ্চয়তা আমাকে শেখাচ্ছে কী জিনিসগুলো আসলেই গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার, স্বাস্থ্য, শান্তি – এগুলো যখন আছে তখন আমরা এদের মূল্য বুঝি না।

জামিউরের বাবা যখন হার্ট অ্যাটাক করলেন, জামিউর আমাকে ফোনে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, “ভাই, এতদিন বাবার সাথে কত খারাপ ব্যবহার করেছি।” কষ্ট তাকে শিখিয়েছিল ক্ষমা চাইতে, ভালোবাসা প্রকাশ করতে। সুখের সময় আমরা যেগুলো ‘পরে করব’ ভাবি, দুঃখ সেগুলো ‘এখনই করো’ বলে।

আরাশ যখন ছোট ছিল, জ্বর এসে একবার খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তিনদিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল। সেই তিনদিন আমি বুঝেছিলাম একটা সুস্থ শিশুর হাসি কত মূল্যবান। আগে আরাশের হৈচৈ আমাকে বিরক্ত করত, সেই অসুস্থতার পর তার প্রতিটা আওয়াজ আমার কাছে সঙ্গীত মনে হয়েছে।

হ্যাপির মা মারা যাওয়ার পর হ্যাপি মাসখানেক কথা বলেনি ঠিকমত। সেই নীরবতা আমাকে শিখিয়েছিল শোনার গুরুত্ব। আগে আমি হ্যাপির কথা অর্ধমনে শুনতাম, সেই সময়ের পর তার প্রতিটা কথা আমার কাছে মূল্যবান হয়ে উঠেছে।

সাইফুল কবির একবার বড় একটা ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়েছিল। তখন সে আমাকে বলেছিল, “ভাই, মনে হচ্ছে আল্লাহ আমাকে পরীক্ষা করছেন।” পরে সে বুঝেছিল যে সেই ক্ষতি তাকে আরো বিনয়ী করেছে, আরো কৃতজ্ঞ করেছে। সুখের সময় আমরা নিজেদের কৃতিত্ব নিই, দুঃখ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় আমরা কত ছোট।

মৃদুলের বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর সে কানাডায় চলে গিয়েছিল। দূর দেশে একা থেকে সে বুঝেছিল নিঃসঙ্গতা কী। সেই নিঃসঙ্গতা তাকে নিজের সাথে বন্ধুত্ব করতে শিখিয়েছে। আগে সে সবসময় কারো না কারো সাথে থাকতে চাইত, এখন সে একা থাকতে পারে, নিজেকে নিয়ে খুশি থাকতে পারে।

আমার মনে হয়, কষ্ট একটা অদ্ভুত শিক্ষক। এটা পাঠ্যবই দিয়ে পড়ায় না, জীবনের ওপর লিখে দেয়। এটা তত্ত্ব শেখায় না, অভিজ্ঞতা দেয়। এটা মাথায় জ্ঞান ভরে না, হৃদয়ে জ্ঞান জাগায়।

সুখের সময় আমরা ভাবি আমরা সবকিছু জানি। দুঃখ আমাদের বলে, “তুমি কিছুই জান না, নতুন করে শেখ।” সুখ আমাদের করে আত্মতুষ্ট, দুঃখ করে আত্মজিজ্ঞাসু।

কষ্টের সবচেয়ে বড় পাঠ হয়তো এই যে জীবন পূর্বাভাসযোগ্য নয়। আমরা যতই পরিকল্পনা করি, যতই নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করি, জীবন তার নিজের নিয়মে চলে। এই অনিয়ন্ত্রণযোগ্যতা প্রথমে ভয় দেয়, পরে শান্তি দেয়। কারণ তখন আমরা বুঝি যে সবকিছু আমাদের হাতে নেই, তাই আমাদের দায়ও সবটা নেই।

কষ্ট আমাদের শেখায় ক্ষমা করতে। নিজেকে, অন্যদের, পরিস্থিতিকে। কারণ রাগ ধরে রাখার মতো শক্তি দুঃখের সময় থাকে না। কষ্ট আমাদের শেখায় অগ্রাধিকার ঠিক করতে। কোনটা সত্যিই জরুরি আর কোনটা না।

আমার নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, আমার সবচেয়ে গভীর বৃদ্ধি হয়েছে সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোতে। যখন সবকিছু ভেঙে পড়ছে মনে হয়েছে, তখনই আমি নতুন করে নিজেকে গড়েছি।

বাবার মৃত্যু আমাকে দায়িত্বশীল করেছে। চাকরির অনিশ্চয়তা আমাকে কৃতজ্ঞ করেছে। আরাশের অসুস্থতা আমাকে যত্নশীল করেছে। হ্যাপির দুঃখ আমাকে ধৈর্যশীল করেছে।

আমি বুঝেছি যে কষ্ট একটা ভাঙার প্রক্রিয়া। কিন্তু যেমন বীজ মাটি ভেঙে গজায়, তেমনি আমাদের পুরানো সীমানা ভেঙে নতুন সম্ভাবনা জন্মায়। কষ্ট আমাদের ছোট করে না, বড় করে। কিন্তু সেই বড় হওয়ার প্রক্রিয়া অনেক সময় ব্যথার।

এই মুহূর্তে, এই লেখাটা লিখতে লিখতে, আমার মনে হচ্ছে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তগুলোর কাছে কৃতজ্ঞ। সেগুলো আমাকে ভেঙেছে, কিন্তু আরো শক্তিশালী করে গড়েছে। সেগুলো আমার চোখে জল এনেছে, কিন্তু দৃষ্টি পরিষ্কার করেছে।

কষ্টের মধ্যে লুকানো জীবনের পাঠ – এই পাঠ পড়তে কেউ চায় না, কিন্তু পড়তে হয়। আর একবার পড়ে ফেললে বোঝা যায়, এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঠ ছিল।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *