বস আবার প্রোজেক্ট রিজেক্ট করেছে। কলিগদের সামনে বলল, “হায়দার, তোমার আইডিয়া তো অসাধারণ!” কিন্তু গলার স্বরে ঠাট্টা। সবাই হাসল। আমিও হাসলাম। কিন্তু ভিতরে কেটে গেলাম।
সার্কাজম আর হিউমারের মধ্যে একটা ধারালো দাগ আছে।
আমিও করি। স্ত্রী দেরি করে খাবার দিলে বলি, “বাহ, কী দারুণ টাইমিং!” সেও বুঝে যায়। কিন্তু কেন এভাবে বলি? সরাসরি বলতে পারি না?
সার্কাজম ব্যথা লুকানোর একটা উপায়।
আরাশ পরীক্ষায় খারাপ করলে বলি, “অবশ্যই, পড়াশোনা করার দরকার নেই!” কিন্তু আসলে মনটা খারাপ। চিন্তিত। তবে সেই আবেগ সরাসরি প্রকাশ করতে পারি না।
কেন পারি না?
হয়তো সরাসরি আবেগ প্রকাশ করা দুর্বলতা মনে হয়। সার্কাজম একটা প্রতিরক্ষা। একটা বর্ম।
বন্ধু মৃদুল কানাডা থেকে ফোন করে। তার নতুন গাড়ির ছবি পাঠায়। আমি বলি, “হ্যাঁ, আমারও একটা রিকশা কিনতে ইচ্ছা করছে।” সে হাসে। কিন্তু আমার ভিতরে ঈর্ষা।
সার্কাজম ঈর্ষা ঢাকার মাস্ক।
অফিসে নতুন পলিসি আসে। আমরা বলি, “চমৎকার! আর একটু চাপ দরকার ছিল!” সবাই হাসে। কিন্তু আসলে সবার মন খারাপ। ভয়। অনিশ্চয়তা।
সার্কাজম দলগত ব্যথা প্রকাশের মাধ্যম।
কিন্তু সার্কাজমের সমস্যা হচ্ছে—এটা দূরত্ব তৈরি করে। যে সার্কাস্টিক, তার কাছে যেতে ভয় লাগে। কারণ সে যেকোনো কথাকে হাসির বিষয় বানিয়ে দিতে পারে।
আমি কি এমন মানুষ হয়ে গেছি?
স্ত্রী মাঝে মাঝে বলে, “তুমি সব কিছু নিয়ে কটাক্ষ করো।” আমি বলি, “অবশ্যই, এটাই তো আমার বিশেষত্ব!” আরও সার্কাজম।
কিন্তু আসলে কী বলতে চাই? হয়তো বলতে চাই—”আমি কষ্ট পাচ্ছি। কিন্তু সেটা সরাসরি বলতে পারি না।”
সার্কাজম আবেগপ্রবণতার বিপরীত মেরু। আবেগ লুকানোর একটা কৌশল।
ব্রিটিশরা সার্কাজমে পারদর্শী। তাদের কালচারে আবেগ প্রকাশ অভদ্রতা। তাই তারা সার্কাজম ব্যবহার করে।
আমরাও কি ব্রিটিশ হয়ে যাচ্ছি?
সবচেয়ে দুঃখের ব্যাপার—সার্কাজম অভ্যাস হয়ে গেলে সরল কথা বলতে ভুলে যাই। সব কিছুতে একটা টুইস্ট থাকতে হয়।
আরাশ একদিন জিজ্ঞেস করল, “বাবা, আপনি কেন সরাসরি কথা বলেন না?” উত্তর খুঁজে পেলাম না।
হয়তো কারণ সরাসরি কথা বেশি বিপজ্জনক। বেশি ভালনারেবল। সার্কাজমে একটা নিরাপত্তা আছে—”আমি তো শুধু রসিকতা করছি।”
কিন্তু যে রসিকতার পেছনে রক্তক্ষরণ, সেটা কি রসিকতা?
সার্কাজম আধুনিক যুগের কান্নার একটা রূপ। এমন কান্না যেটা শোনা যায় না। কিন্তু অনুভব করা যায়।
সমস্যা হচ্ছে—অন্যরা সেই কান্না ধরতে পারে না। মনে করে আমরা হাসছি।
সার্কাজম কি আমাদের আবেগীয় দেউলিয়াত্বের লক্ষণ?
একটু ভাবনা রেখে যান