আজ সকালে হ্যাপিকে বলেছিলাম, “আরাশের জন্য একটা ভালো স্কুল খুঁজে দেখি।”
কিন্তু সন্ধ্যায় ফিরে দেখি হ্যাপি কাঁদছে। জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে। সে বলল, “তুমি বলেছ আরাশ নাকি পড়ালেখায় খারাপ?”
আমি স্তব্ধ। আমি তো সেরকম কিছু বলিনি।
“আমি বলেছিলাম ভালো স্কুলের কথা…”
“হ্যাঁ, মানে এই স্কুলে ভালো হচ্ছে না।”
“না, আমি বলতে চেয়েছি…”
কিন্তু হ্যাপি আর শুনল না। ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
এরকম হয় প্রায়ই। আমি একটা কথা বলি, আর সেটা অন্য কিছু হয়ে পৌঁছায়। যেন আমার মুখ থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে শব্দগুলো নিজের মতো করে বদলে যায়।
গত সপ্তাহে অফিসে সাহেবকে বলেছিলাম, “এই ফাইলটা একটু জরুরি।” তিনি বুঝলেন আমি তাড়াহুড়ো করছি। পরদিন ডেকে বললেন, “হায়দার, কাজে তাড়াহুড়ো করতে নেই।”
কিন্তু আমি তো তাড়াহুড়োর কথা বলিনি। জরুরি মানে তাড়াহুড়ো নয়।
আরাশের সাথে কথা বলতে গেলে আরো সমস্যা। গত মাসে বলেছিলাম, “তুমি যদি পরীক্ষায় ভালো করো, তাহলে একটা উপহার দেবো।”
সে কান্নাকাটি শুরু করল। বলল, “তুমি বলছ আমি খারাপ করি?”
এই কি আমার অভিশাপ? আমি যা বলতে চাই, আর লোকে যা শোনে – এই দুইয়ের মধ্যে একটা অদৃশ্য দেয়াল আছে। আমার কথা সেই দেয়াল পেরিয়ে যেতে যেতে বিকৃত হয়ে যায়।
ছোটবেলায় একবার মাকে বলেছিলাম, “আজ স্কুলে আমি একটা কবিতা বলেছি।” মা খুশি হয়ে বলেছিলেন, “বাহ, আমার ছেলে কবি হবে।”
কিন্তু আমি কবিতা লেখার কথা বলিনি। শুধু বলেছিলাম।
হয়তো সেই থেকেই শুরু। আমার শব্দগুলো কোনো অজানা কারণে রূপান্তরিত হয়ে যায়। ভালোবাসার কথা হয়ে যায় সন্দেহ। প্রশংসার কথা হয়ে যায় সমালোচনা। উৎসাহের কথা হয়ে যায় চাপ।
বন্ধু জামিউলকে যখন বলি, “তোমার ব্যবসা ভালো চলছে তো?” সে ভাবে আমি তার ব্যবসার খোঁজখবর নিচ্ছি টাকা ধার নেওয়ার জন্য।
সাইফুলকে যখন বলি, “তোমার বাড়িটা সুন্দর হয়েছে,” সে ভাবে আমি হিংসা করছি।
আমার প্রতিটি কথা যেন একটা ভাঙা আয়নার মধ্য দিয়ে যায়। সরল কথা হয়ে যায় জটিল। সহজ কথা হয়ে যায় কঠিন।
রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবি, এই সমস্যাটা আমার একার, নাকি সবার? হয়তো প্রত্যেকেরই কথা অন্যের কাছে ভুল অর্থে পৌঁছায়।
কিন্তু তাহলে মানুষে মানুষে ভালোবাসা কীভাবে? বন্ধুত্ব কীভাবে? সম্পর্ক কীভাবে টিকে থাকে?
নাকি আমার মুখে কোনো অভিশাপ আছে? আল্লাহ কি আমাকে এমনভাবে বানিয়েছেন যে আমি যা বলি, সেটা অন্য কিছু হয়ে পৌঁছায়?
আজ রাতে আরাশকে বলব, “বাবা তোমাকে ভালোবাসে।”
কিন্তু সে কী শুনবে?
একটু ভাবনা রেখে যান