ব্লগ

কর্মক্ষেত্রের কৃত্রিম দেয়াল

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

আজ অফিসে নতুন একজন মেয়ে জয়েন করেছে। নাম তানিয়া। কম্পিউটার সায়েন্সে গ্রাজুয়েট। কিন্তু প্রোগ্রামারের পোস্টে তাকে রাখা হলো না। দেওয়া হলো রিসেপশনিস্টের চাকরি।

বসের কাছে জিজ্ঞেস করলাম, “স্যার, তানিয়া তো টেকনিক্যাল কোয়ালিফাইড। তাকে প্রোগ্রামিং টিমে রাখলেন না কেন?”

বস হেসে বলল, “হায়দার, মেয়েরা টেকনিক্যাল ফিল্ডে বেশি টিকতে পারে না। বিয়ে-শাদি, বাচ্চা-কাচ্চা হলে ছেড়ে দেবে। তাছাড়া রাত করে কাজ করতে পারবে? ক্লায়েন্ট মিটিংয়ে ভ্রমণ করতে পারবে?”

“কেন পারবে না?” জিজ্ঞেস করলাম।

“আরে ভাই, পারিবারিক দায়িত্ব তো মেয়েদের। আর আমাদের সমাজে মেয়েদের রাতে কাজ করাটা ভালো দেখায় না।”

আমি অবাক। তানিয়া এমএসসি করেছে, কিন্তু তার যোগ্যতার মূল্যায়ন হচ্ছে না তার লিঙ্গের জন্য?

লাঞ্চের সময় তানিয়ার সাথে কথা হলো। মুখে হতাশার ছাপ। “ভাইয়া, আমি চার বছর পড়ালেখা করেছি প্রোগ্রামিং নিয়ে। কিন্তু আমার চাকরি হচ্ছে ভিজিটর রিসিভ করা।”

“তুমি বস সাহেবকে বলেছো?”

“বলেছি। উনি বলেছেন এই চাকরি করে এক্সপেরিয়েন্স নাও। পরে দেখা যাবে।”

বাসায় ফিরে হ্যাপিকে বললাম। হ্যাপি বলল, “আমিও তো এইচএসসি এর পর বিয়ে হয়ে গেল। ভেবেছিলাম কলেজ ছাড়ার পর চাকরি করব। কিন্তু সবাই বলল – বিয়ের পর মেয়েদের কাজ করা ঠিক না।”

“তুমি কি কাজ করতে চেতে?”

“খুব। শিক্ষকতা করতে ইচ্ছা ছিল। এখনো আছে। কিন্তু এই বয়সে শুরু করা কঠিন।”

আরাশ বলল, “আব্বু, আমাদের ক্লাসের মিস শারমিন খুব ভালো ইংরেজি পড়ান। উনি তো কাজ করেন।”

“হ্যাঁ, কিছু মেয়ে করে। কিন্তু তাদের অনেক বাধা পার হতে হয়।”

রাতে ইন্টারনেটে খোঁজ নিয়ে দেখি মুসলিম দেশগুলোতে নারীর কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের হার অনেক কম। অথচ ইসলামের প্রথম দিকে নারীরা ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা, শিক্ষাদানে সক্রিয় ছিলেন।

খাদিজা (রা) ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। রসুল (সা) তার কর্মচারী ছিলেন। উনি নিজেই রসুল (সা) কে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

শিফা বিনতে আবদুল্লাহ (রা) ছিলেন বাজার পরিদর্শক (হিসবাহ)। উমর (রা) তাকে এই দায়িত্ব দিয়েছিলেন।

উম্মে আতিয়া (রা) ছিলেন একজন সার্জন। যুদ্ধের সময় আহতদের চিকিৎসা করতেন।

তাহলে আজকে কেন বলা হয় নারীদের কাজ করা ‘ইসলামিক’ নয়?

আমি ভাবি, যারা এই বাধা সৃষ্টি করেন তাদের আসল উদ্দেশ্য কী? তারা কি সত্যিই ধর্মের কথা ভাবেন, নাকি নিজেদের পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য রক্ষা করতে চান?

একটি পরিবারে যদি স্ত্রীও কামাই করে, তাহলে তো পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো হয়। বাচ্চাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা সব উন্নত হয়।

আমাদের দেশে যেসব পরিবারে স্ত্রীও কাজ করে, তাদের জীবনযাত্রার মান দেখি বেশি।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভাবি। আমার যদি আর্থিক সংকট হয়, হ্যাপি যদি কাজ করে সাহায্য করতে চায়, তাহলে তাকে বাধা দেওয়া কি ন্যায্য?

কুরআনে আছে (নিসা ৪:৩২), “পুরুষদের জন্য রয়েছে তাদের উপার্জনের অংশ এবং নারীদের জন্য রয়েছে তাদের উপার্জনের অংশ।”

এখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে নারীদেরও উপার্জনের অধিকার আছে।

হাদিসে আছে, রসুল (সা) বলেছেন, “আল্লাহ প্রত্যেক কারিগরকে তার কাজ ভালোবাসতে চান।” এখানে কি শুধু পুরুষ কারিগরের কথা বলা হয়েছে?

আমার মনে হয়, যারা ধর্মের নাম করে নারীদের কর্মক্ষেত্রে আসতে বাধা দেন, তারা আসলে ইসলামের ক্ষতি করেন। তারা অর্ধেক জনশক্তিকে অকর্মণ্য রাখতে চান।

একটি জাতি কিভাবে এগোবে যদি তার অর্ধেক মানুষ ঘরে বন্দী থাকে?

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *