আরাশের বন্ধুরা বসে পেশা নিয়ে আলাপ করছে।
“আমার বাবা ডাক্তার। হার্টের অপারেশন করেন।” রিহান গর্বের সাথে বলে।
“আমার বাবা ইঞ্জিনিয়ার। রোড বানান।” সুমন বলে।
“আমার বাবা ব্যাংকের ম্যানেজার।” তানভীর বলে।
তারপর সবাই আরাশের দিকে তাকায়।
“তোর বাবা কী করে?”
আরাশ চুপ হয়ে যায়। আমি দূর থেকে দেখছি। আমি জানি সে কী ভাবছে।
তার বাবা কী করে? লেখালেখি? কিন্তু সেটা কি কোনো পেশা? লেখালেখি করে পেট চলে?
আরাশ বলে, “আমার বাবা… আমার বাবা লেখে।”
“লেখে মানে?”
“বই-টই লেখে।”
রিহান জিজ্ঞেস করে, “কত টাকা পায়?”
আরাশ উত্তর দিতে পারে না। কারণ সে জানে তার বাবার আয় তার বন্ধুদের বাবাদের তুলনায় কত কম।
“আমার বাবা বলেছে, লেখালেখি হলো ভুখা মানুষের কাজ।” সুমন বলে।
আরাশ মাথা নিচু করে।
সন্ধ্যায় আরাশ বাড়ি ফিরে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করে, “বাবা, লেখালেখি কি একটা ভালো কাজ?”
আমার গলায় কিছু একটা আটকে যায়।
“কেন এই প্রশ্ন?”
“রিহান বলেছে, লেখকরা গরিব হয়।”
আমি কিছুক্ষণ চুপ থাকি। তারপর বলি, “আরাশ, লেখালেখি একটা সুন্দর কাজ।”
“কিন্তু তাতে টাকা কম?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে কেন তুমি এই কাজ কর?”
আমি কীভাবে বোঝাব যে টাকা দিয়ে সবকিছু মাপা যায় না? কীভাবে বোঝাব যে কিছু কাজ আছে যা মনের জন্য করতে হয়?
“আরাশ, আমি এই কাজ ভালোবাসি।”
“কিন্তু আমরা তো গরিব হয়ে যাচ্ছি।”
আরাশের এই কথায় আমার বুক চিরে যায়। একটা এগারো বছরের বাচ্চা বুঝে গেছে তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা।
আমি ভাবি, আমি কি ভুল করেছি? আমার কি ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়া উচিত ছিল?
কিন্তু তাহলে আমি কি সুখী হতাম?
রাতে হ্যাপি আমাকে বলে, “আরাশ তার বন্ধুদের সাথে মিশতে পারছে না। তাদের জীবনযাত্রা আর আমাদের জীবনযাত্রার মধ্যে পার্থক্য।”
“আমি কী করব?”
“জানি না। কিন্তু আরাশ কষ্ট পাচ্ছে।”
আমি বুঝতে পারি, আমার পেশা শুধু আমার সমস্যা নয়। এটা আমার পুরো পরিবারের সমস্যা।
আরাশ লজ্জা পায় তার বাবার পেশা নিয়ে। হ্যাপি চিন্তায় থাকে আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে।
কিন্তু আমি যদি লেখালেখি ছেড়ে দিই, তাহলে আমি আর আমি থাকব না।
আমি একটা দোটানার মধ্যে আছি। পরিবারের খুশির জন্য নিজেকে বিসর্জন দেব, নাকি নিজের জন্য পরিবারকে কষ্ট দেব?
কোনটা ঠিক?
আল্লাহ, আমাকে পথ দেখান।
একটু ভাবনা রেখে যান