জুম মিটিং চলছে। বস একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করেছেন। আমার মতামত জানতে চেয়েছেন। আমি খুব গুছিয়ে উত্তর দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। মুখ খুলি, কথা বলি। কিন্তু সবাই চুপচাপ তাকিয়ে আছে। তারপর বসের কণ্ঠে শোনা যায় সেই চিরপরিচিত বাক্য – “হায়দার, ইউ আর মিউটেড।”
এই মুহূর্তে মনে হয় যেন পুরো পৃথিবী আমাকে দেখে হাসছে। আমি কত সুন্দর করে মুখ নেড়েছি, হাত নেড়েছি, অথচ একটা আওয়াজও কেউ শুনতে পায়নি। যেন আমি একটা মাইম আর্টিস্ট।
তাড়াতাড়ি মাইক আনমিউট করি। “সরি, মাইক মিউট ছিল।” এই কথাটা বলতে গিয়েই আবার লজ্জায় মরে যাই। কারণ এই একই কথা আমি এই মাসেই অন্তত পাঁচবার বলেছি।
কেন এমন হয় আমার সাথে? অন্যরা কি এত ভুল করে? নাকি আমিই একমাত্র যে মিউট-আনমিউট নিয়ে এত কনফিউজড?
মিটিং শুরুর আগে অনেকবার চেক করি। মাইক চালু আছে কিনা। স্পিকার ঠিক আছে কিনা। কিন্তু মিটিং চলাকালীন কোনো এক সময় মাইক মিউট হয়ে যায়। কখন, কিভাবে – কিছুই মনে থাকে না।
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, “এই প্রযুক্তিগত সমস্যাগুলো থেকে আমাকে রক্ষা করো।” কিন্তু মনে হয় আল্লাহও হাসেন আমার এই ডিজিটাল অক্ষমতা দেখে।
সবচেয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতি হয় যখন আমি দীর্ঘ একটা বক্তব্য দেওয়ার চেষ্টা করি। পাঁচ মিনিট ধরে বলে যাই। তারপর বুঝি কেউ কিছু শুনতে পায়নি। সবাই ভদ্রভাবে অপেক্ষা করেছে কখন আমি বুঝব যে মাইক বন্ধ।
একবার উপস্থাপনা দিচ্ছিলাম। খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রজেক্ট। স্লাইড শেয়ার করেছি, কথা বলা শুরু করেছি। দশ মিনিট পর বুঝলাম আমার কথা কেউ শুনতে পাচ্ছে না। সেই লজ্জায় মুখ দেখানোর উপায় ছিল না।
আরাশ একদিন আমার জুম মিটিং দেখে বলেছিল, “আব্বু, আপনি কেন এত ভুল করেন?” আমি বললাম, “এই টেকনোলজি আমার জন্য নয়।” কিন্তু সে বলল, “এটা তো খুব সিম্পল।”
হ্যাপিও বলে, “তুমি অন্য সব কাজ পার, শুধু জুমে সমস্যা কেন?” আমার কাছেও এই প্রশ্নের উত্তর নেই।
হয়তো এটা বয়সের ব্যাপার। নতুন প্রযুক্তির সাথে মানিয়ে নিতে সময় লাগে। অথবা হয়তো আমার মস্তিষ্ক মাল্টিটাস্কিংয়ে অভ্যস্ত নয়। মিটিংয়ে মনোযোগ দিতে গিয়ে মাইকের কথা ভুলে যাই।
অফিসের তরুণ সহকর্মীরা এসব নিয়ে কোনো সমস্যায় পড়ে না। তাদের কাছে এটা যেন শ্বাস নেওয়ার মতো স্বাভাবিক।
একবার ভেবেছিলাম আগে থেকেই বলে রাখব, “আমার মাইক সমস্যা হতে পারে।” কিন্তু তাহলে মনে হবে আমি খুবই অদক্ষ।
এখন অন্তত জেনে গেছি যে “ইউ আর মিউটেড” শুনলে লজ্জা না পেয়ে তাড়াতাড়ি আনমিউট করতে হয়। এবং হাসিমুখে বলতে হয়, “সরি।”
কিন্তু মনের ভিতর থেকে যায় সেই প্রশ্ন – কেন আমি এত সাধারণ একটা কাজেও এত ভুল করি?
একটু ভাবনা রেখে যান