বাস স্ট্যান্ডের পাশে লটারির দোকান। লোকটার সামনে রঙিন কাগজ ঝুলছে।
সোহেল থামে।
“ভাই, একটা দেন।”
“কত টাকার?”
পকেটে হাত দেয়। দুইটা দশ টাকার নোট। ভাঁজ করা। এক কোণা ছেঁড়া।
“বিশ।”
লোকটা একটা টিকিট ছিঁড়ে দেয়। ৭৮৯৪৫২।
সোহেল সংখ্যাটা পড়ে। আবার পড়ে। মুখে বলে — সাত, আট, নয়, চার, পাঁচ, দুই।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে বলে। বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলে। পাশের লোকটা ঘুমাচ্ছে। মাথা কাঁপছে বাসের ঝাঁকুনিতে।
সাত, আট, নয়, চার, পাঁচ, দুই।
ঘরে ঢুকে আলমারি খোলে। শিউলির শাড়ির নিচে রাখে।
শিউলি রান্নাঘরে। পেঁয়াজ কাটছে। চোখ লাল।
সোহেল শোবার ঘরে যায়। দরজা বন্ধ করে।
বিছানায় বসে। পকেট থেকে মোবাইল বের করে। ক্যালকুলেটর খোলে।
এক কোটি।
ব্যাংকে রাখলে ছয় পার্সেন্ট। মাসে পঞ্চাশ হাজার।
পঞ্চাশ হাজার টাকা। প্রতি মাসে।
সোহেলের বেতন বাইশ হাজার।
রাতে শুয়ে আছে। ঘুম নেই।
পাশে শিউলি। শ্বাসের শব্দ। ঘুমিয়ে গেছে।
সোহেল মোবাইল খোলে। আলো জ্বলে ওঠে।
শিউলি নড়ে। “কী করছ?”
“কিছু না।”
শিউলি পাশ ফিরে শোয়।
সোহেল ক্যালকুলেটরের দিকে তাকিয়ে থাকে। ৫০,০০০। সংখ্যাটা জ্বলছে।
সকালে নাস্তার টেবিলে।
রুবি স্কুলের জন্য তৈরি হচ্ছে। চুল বাঁধছে। আয়নার সামনে।
“বাবা, তুমি রাতে কী দেখছিলে?”
সোহেল থামে। রুটি হাতে।
“কখন?”
“ফোনে। আলো দেখলাম।”
“কিছু না।”
রুবি আয়না থেকে ঘুরে তাকায়। কিছু বলে না। স্কুল ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে যায়।
দরজা বন্ধ হয়।
শিউলি চা ঢালছে। “আজ টিফিন দিইনি। টাকা ছিল না।”
সোহেল চায়ে চুমুক দেয়। গরম।
অফিসে। তিনতলায়। জানালার পাশে ডেস্ক।
কম্পিউটারের সামনে বসে আছে সোহেল। স্ক্রিনে এক্সেল শিট। সংখ্যা। অনেক সংখ্যা।
কিন্তু মাথায় একটাই — ৭৮৯৪৫২।
জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। নিচে রাস্তা। একটা রিকশা যাচ্ছে। রিকশাওয়ালার গায়ে ঘাম। পিঠে ভেজা দাগ।
সাহেব ডাকে। “সোহেল, রিপোর্ট?”
“আসছে স্যার।”
সোহেল স্ক্রিনের দিকে তাকায়। সংখ্যাগুলো ঝাপসা।
বিকেলে বাড়ি ফিরে আলমারি খোলে।
টিকিটটা আছে। শাড়ির নিচে। যেখানে রেখেছিল।
বের করে দেখে। ৭৮৯৪৫২।
শিউলি দরজায় দাঁড়িয়ে। হাতে হলুদের দাগ।
“ওইটা?”
“হুঁ।”
“যদি না হয়?”
সোহেল চুপ থাকে।
শিউলি দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর রান্নাঘরে ফিরে যায়।
বুধবার। বৃহস্পতিবার।
সোহেল গোনে। দিন গোনে।
রাতে ঘুম হয় না। দিনে কাজে মন বসে না।
বৃহস্পতিবার রাতে শিউলি জিজ্ঞেস করে, “ক্লান্ত লাগছে?”
“না।”
“চোখ লাল।”
সোহেল কিছু বলে না।
শিউলি বালিশ ঠিক করে দেয়। “ঘুমাও।”
সোহেল চোখ বন্ধ করে। ঘুম আসে না।
শুক্রবার সকাল।
সোহেল ঘুম থেকে উঠে বিছানায় বসে। মোবাইল হাতে।
হাত কাঁপছে।
লটারির ওয়েবসাইট। লোডিং। ধীরে ধীরে।
শিউলি দরজায় দাঁড়িয়ে। চায়ের কাপ হাতে।
“এল?”
“আসছে।”
পেজ লোড হয়।
প্রথম পুরস্কার — ১২৩৯৮৭।
সোহেল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে।
১২৩৯৮৭।
প্রথম সংখ্যাই মেলেনি।
পেজ রিফ্রেশ করে। আবার।
১২৩৯৮৭।
শিউলি কিছু জিজ্ঞেস করে না। চায়ের কাপ টেবিলে রেখে চলে যায়।
সোহেল চায়ে চুমুক দেয়। ঠান্ডা হয়ে গেছে।
আলমারি খোলে।
টিকিটটা বের করে।
কাগজটা হাতে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে।
তারপর ছেঁড়ে। দুই টুকরো। চার টুকরো। আট টুকরো। ষোলো।
ডাস্টবিনে ফেলে।
রুবি দৌড়ে আসে। “বাবা, কী ছিঁড়লে?”
“কাগজ।”
“কীসের?”
“পুরনো।”
রুবি ডাস্টবিনের দিকে তাকায়। রঙিন টুকরো। তারপর সোহেলের দিকে।
“তোমার চোখ লাল কেন?”
“ঘুম হয়নি।”
রুবি চলে যায়।
বিকেলে বাজারে যায় সোহেল।
আলু, পটল, বেগুন।
ফেরার পথে সেই দোকান। লটারির দোকান।
লোকটা বসে আছে। সামনে রঙিন কাগজ। নতুন টিকিট।
সোহেল থামে।
পকেটে বাজারের বাকি টাকা। পঁয়ত্রিশ টাকা।
লোকটা তাকায়।
সোহেল দাঁড়িয়ে থাকে। দোকানের সামনে। মানুষ পাশ দিয়ে যাচ্ছে।
তারপর হাঁটে। থামে না।
বাড়ি ফিরে সবজি রাখে।
শিউলি ব্যাগ খোলে। “মরিচ?”
“ভুলে গেছি।”
শিউলি কিছু বলে না। ব্যাগ থেকে বেগুন বের করে।
রাতে রুবিকে ঘুম পাড়াচ্ছে সোহেল।
“বাবা, গল্প বলো।”
“কোন গল্প?”
“যেকোনো।”
সোহেল ভাবে। মাথায় কিছু আসে না।
“একটা লোক ছিল…”
“তারপর?”
“সে… সে একটা জিনিস খুঁজছিল।”
“কী জিনিস?”
সোহেল চুপ করে থাকে।
“বাবা?”
“জানি না। সে নিজেও জানত না।”
রুবি কিছুক্ষণ চুপ থাকে।
“লোকটা কি পেয়েছিল?”
“গল্প শেষ হয়নি।”
“কবে শেষ হবে?”
সোহেল রুবির মাথায় হাত রাখে। চুল নরম। শিউলির মতো।
“ঘুমাও।”
রুবি চোখ বন্ধ করে।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে সোহেল।
আকাশে তারা নেই। মেঘ।
পাশের বাড়িতে টিভির আওয়াজ। কোনো সিরিয়াল।
নিচে রাস্তায় একটা কুকুর হাঁটছে। একা।
শিউলি এসে দাঁড়ায়। কিছু বলে না। পাশে দাঁড়িয়ে থাকে।
দুজনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।
“শিউলি।”
“হুঁ?”
“তুমি কি কখনো ভাবো… অন্যরকম হলে…”
“কীরকম?”
সোহেল কিছু বলে না।
শিউলি ভেতরে যায়।
সোহেল দাঁড়িয়ে থাকে।
কুকুরটা চলে গেছে। রাস্তা খালি।
রাতে বিছানায়।
শিউলি ঘুমিয়ে গেছে। শ্বাস সমান।
সোহেল ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে। একটা দাগ। গত বর্ষায় পানি চুইয়েছিল।
পকেটে হাত দেয়। খালি।
বিশ টাকা। বিশ টাকায় স্বপ্ন কেনা যায়।
চোখ বন্ধ করে।
শনিবার সকাল।
সোহেল উঠে জানালা খোলে।
রোদ উঠেছে। গরম।
নিচে রাস্তায় একটা রিকশা যাচ্ছে। রিকশাওয়ালা সিটে বসে আছে। খদ্দের নেই। অপেক্ষা করছে।
রুবি এসে দাঁড়ায়। “বাবা, আজ কোথাও যাব?”
“কোথায়?”
“জানি না। বাইরে।”
সোহেল তাকায়। রুবি অপেক্ষা করছে।
“দেখি।”
রুবি চলে যায়।
সোহেল জানালার কাছে দাঁড়িয়ে থাকে।
রিকশাওয়ালা এখনো বসে আছে। একটা লোক এসে উঠল। রিকশা চলে গেল।
সোহেল ঘরে ফেরে।
আলমারি খোলে। শাড়ির নিচে হাত দেয়।
খালি।
ডাস্টবিনের দিকে তাকায়।
কাল রাতে আবর্জনা ফেলে দিয়েছে শিউলি।
বিকেলে বাজারে যায়।
একই রাস্তা। একই দোকানপাট।
লটারির দোকান।
লোকটা বসে আছে। রঙিন কাগজ ঝুলছে।
সোহেল থামে না। হেঁটে যায়।
তারপর থামে।
ঘুরে তাকায়।
দোকান। রঙিন কাগজ। নতুন সংখ্যা।
সোহেল দাঁড়িয়ে থাকে। রাস্তার মাঝখানে।
একটা রিকশা হর্ন দেয়। সোহেল সরে যায়।
পকেটে হাত দেয়।
টাকা আছে।
একটু ভাবনা রেখে যান