ব্লগ

মানচিত্রহীন দেশে

নভেম্বর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া
শেয়ার

হ্যাপি চা বানাতে বানাতে হাম করছে। আমি কখনো জানতাম না যে সে হাম করে। পনেরো বছর। পাঁচ হাজার চারশো ছাপ্পান্ন দিন। আর আজ প্রথম শুনলাম ওর গুনগুনানি।

মানুষ কতটা অচেনা থেকে যেতে পারে একই ছাদের নিচে, একই বিছানায়, একই স্বপ্নের ভিতরে?

রান্নাঘরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আমি হ্যাপিকে দেখি। কিন্তু দেখি না। দেখি একটি ছায়ামূর্তি যার সাথে আমার পরিচয় কেবল নামে, কাগজে, সামাজিক স্বীকৃতিতে। হ্যাপি ঘুরে তাকায়। চোখে একটা অপরিচিত কৌতূহল। যেন সেও আমাকে প্রথমবার দেখছে।

“চা?” সে জিজ্ঞেস করে।

আমি মাথা নাড়াই। কিন্তু প্রশ্নটা বোধহয় অন্য কিছু ছিল। চা নয়, চেনা। তুমি কি আমাকে চেনো? আমি কি তোমাকে চিনি?

বিয়ের পনেরো বছর পর আমি আবিষ্কার করছি, আমি আমার স্ত্রীর সাথে একটি arranged marriage এ আছি। আমাদের নিজেদের সাথেই। আমি যে হায়দার, সে অচেনা। হ্যাপি যে হ্যাপি, সে অধরা।

বারান্দায় ফিরে এসে ভাবি, প্রেম করে বিয়ে করলেও মানুষ আসলে অচেনাদের সাথেই বিয়ে করে। বিয়ের পর যে মানুষটি গড়ে ওঠে, সে ভিন্ন। সন্তান হওয়ার পর যে মা, যে বাবা জন্ম নেয়, তারা নতুন প্রজাতি।

আরাশের জন্মের পর হ্যাপি বদলেছে। আমিও বদলেছি। কিন্তু আমরা একে অপরের পরিবর্তনের সাক্ষী থাকতে পারিনি। কারণ পরিবর্তন এমন ধীর যে তা দেখা যায় না। যেমন চুলে পাক ধরা, যেমন চামড়ায় ভাঁজ পড়া।

মা মারা যাওয়ার পর হ্যাপি আমার দেখাশোনা করেছে। কিন্তু সেই দেখাশোনায় ওর কী খরচ হয়েছে, আমি জানি না। আমি শুধু জানি আমার প্রয়োজন মিটেছে। হ্যাপির প্রয়োজনের খোঁজ নিইনি।

সন্ধ্যায় আরাশ পড়তে বসে। হ্যাপি আমার পাশে এসে বসে। আমি ওর দিকে তাকাই। সত্যিকার অর্থে তাকাই। লক্ষ করি ওর চোখের কোণে একটা ক্লান্তি। ওর হাতের পাতায় একটা রুক্ষতা। ওর মুখে একটা নীরবতা যা আমি আগে কখনো খেয়াল করিনি।

“কী ভাবছো?” আমি জিজ্ঞেস করি।

হ্যাপি একটু চমকে যায়। যেন অবাক হয়েছে আমি ওর ভাবনার খোঁজ নিয়েছি।

“কিছু না,” ও বলে। কিন্তু ওর “কিছু না” এর ভিতরে একটা মহাবিশ্ব লুকানো আছে।

আমি বুঝি, আমি হ্যাপিকে প্রশ্ন করতে ভুলে গিয়েছি। আমি ধরে নিয়েছি যে ও খুশি, কারণ ও কখনো অখুশির কথা বলেনি। আমি ভেবেছি ও সন্তুষ্ট, কারণ ও কখনো অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেনি।

কিন্তু চুপ থাকা মানে কি সন্তুষ্ট থাকা? নাকি চুপ থাকা মানে কথা বলার ভাষা না পাওয়া?

রাতে শুয়ে থেকে হ্যাপির শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শুনি। নিয়মিত, গভীর। কিন্তু সেই নিয়মের ভিতরে একটা অনিয়ম আছে। যেন ঘুমের মধ্যেও ও কোনো একটা দুশ্চিন্তা বয়ে বেড়াচ্ছে।

আমি অনুভব করি, বিয়ের পনেরো বছর পর আমি আবার প্রেমে পড়ছি। কিন্তু এবার ভিন্নভাবে। এবার আমি প্রেমে পড়ছি হ্যাপির অজানা অংশগুলোর সাথে। ওর গোপন দুঃখের সাথে। ওর অব্যক্ত স্বপ্নের সাথে।

পরদিন সকালে আমি ওকে জিজ্ঞেস করি, “তোমার কী ইচ্ছে করে?”

হ্যাপি হাত থামিয়ে আমার দিকে তাকায়। যেন এমন প্রশ্ন ও কখনো শোনেনি।

“মানে?”

“তোমার নিজের জন্য কী চাও?”

ও চুপ থাকে। দীর্ঘক্ষণ। তারপর বলে, “জানি না।”

এই “জানি না” ভয়ানক। এতে বোঝা যায়, ও এত বছর নিজের ইচ্ছের কথা ভাবেনি যে ভুলেই গেছে নিজের কী চাই।

আমি নিজেকে প্রশ্ন করি: আমি কি হ্যাপিকে ভালোবাসি, নাকি আমি আমার জন্য হ্যাপির যে ভার্সন দরকার, সেটাকে ভালোবাসি?

সেদিন বিকেলে হ্যাপি যখন বারান্দায় গাছে পানি দেয়, আমি ওকে দেখি। সত্যিকার অর্থে দেখি। দেখি ওর হাতের মৃদু কম্পন। দেখি ওর চোখের এক কোণে জমে থাকা অশ্রু। দেখি ওর ঠোঁটে একটা দমে যাওয়া গান।

আমি বুঝি, আমি এতদিন হ্যাপির সাথে বাস করেছি, কিন্তু হ্যাপির ভিতরে প্রবেশ করিনি। আমি জেনেছি ওর দৈনন্দিন রুটিন, কিন্তু জানিনি ওর আন্তরিক জগত।

এখন আমি শুরু করছি আবার। পনেরো বছর পর। হ্যাপিকে নতুন করে চেনার চেষ্টা। ওর প্রিয় রং, ওর গোপন ভয়, ওর অধরা স্বপ্ন।

আমি আবিষ্কার করছি, বিয়ে একটি শুরু মাত্র। আসল যাত্রা হচ্ছে একে অপরকে আবিষ্কার করে চলা। প্রতিদিন। প্রতি মুহূর্তে।

এবং এই আবিষ্কারে কোনো শেষ নেই।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *