লাইনে দাঁড়িয়ে নম্বরের অপেক্ষায় হঠাৎ বুঝলাম আমি আস্তে আস্তে একটা সংখ্যা হয়ে উঠছি। জন্মের পর থেকে আমাকে বিভিন্ন নম্বর দেওয়া হয়েছে। আর এই নম্বরগুলোই এখন আমার পরিচয়। হায়দার নামটা শুধু একটা লেবেল, আসল পরিচয় হলো নম্বর।
জন্মের পর প্রথম নম্বর পেয়েছিলাম জন্ম নিবন্ধনে। একটা লম্বা সংখ্যা। সেটাই আমার প্রথম পরিচয়পত্র। তারপর স্কুলে ভর্তি হয়ে রোল নম্বর। ক্লাসে আমাকে নাম ধরে না ডেকে রোল নম্বর ধরে ডাকত।
“২৩ নম্বর, দাঁড়াও।” “২৩ নম্বর, বোর্ডে এসো।” আস্তে আস্তে আমি ২ৣ নম্বর হয়ে গেলাম।
পরীক্ষার সময় আরেকটা নম্বর। পরীক্ষার রোল। সেই নম্বর দিয়ে পরীক্ষা দিতাম। ফলাফলেও সেই নম্বর। “২৩৪৫৬৭ নম্বর পাস।” আমি আর হায়দার নই, আমি ২৩৪৫৬৭।
জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়ার পর আরও বড় একটা নম্বর। ১৭ ডিজিটের। এই নম্বরটাই এখন আমার মূল পরিচয়। যেকোনো কাজে এই নম্বর দিতে হয়।
ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলতে গিয়ে আরেকটা নম্বর। মোবাইল ফোনের জন্য আরেকটা নম্বর। প্রতিটা সেবার জন্য আলাদা নম্বর।
চাকরিতে আমি একটা এমপ্লয়ি আইডি নম্বর। অফিসে আমাকে নাম দিয়ে চেনে না, আইডি দিয়ে চেনে। “এইচআর-০০১২৩ কোথায়?” মানে আমি কোথায়।
হাসপাতালে গেলে আমি একটা রোগী নম্বর। ডাক্তার আমার চেহারা দেখে না, ফাইলের নম্বর দেখে। “২৩৪ নম্বর রোগী কেমন আছে?”
আরাশের স্কুলেও একই ব্যাপার। ওকে নাম দিয়ে ডাকে না। “ক্লাস ফাইভ, রোল ১২।” ও-ও আস্তে আস্তে একটা নম্বর হয়ে যাচ্ছে।
হ্যাপি বলে, “তুমি এত নম্বর মনে রাখো কীভাবে?” আমি বলি, “এগুলো ছাড়া তো আমার কোনো পরিচয় নেই।”
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, “হে আল্লাহ, তোমার কাছে কি আমার কোনো নম্বর আছে?” কিন্তু মনে হয় আল্লাহর কাছেও হয়তো আমার একটা নম্বর আছে। কিয়ামতের দিন হয়তো সেই নম্বর ধরেই ডাকা হবে।
সবচেয়ে বিচিত্র ব্যাপার হলো, এই নম্বরগুলো আমার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমি মারা গেলে হায়দার নামটা মরে যাবে। কিন্তু নম্বরগুলো থেকে যাবে। সিস্টেমে রেকর্ড হয়ে থাকবে।
আমার জন্ম নিবন্ধন নম্বর থাকবে। জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর থাকবে। ব্যাংক অ্যাকাউন্টের নম্বর থাকবে। আমার মৃত্যুর পরেও আমি সংখ্যা হয়ে বেঁচে থাকব।
কখনো কখনো মনে হয় আমি একটা বারকোড। মানুষরা স্ক্যান করে দেখে আমি কে। আমার গায়ে বিভিন্ন নম্বর লেখা আছে। সেই নম্বর দেখেই আমার পরিচয়।
অফিসে কলিগরা আমার আইডি নম্বর মনে রাখে। নাম ভুলে যায়। “ও যে এইচআর-০০১২৩।” হ্যাঁ, আমি এইচআর-০০১২৩।
আমার ভোটার নম্বর আছে। সেই নম্বর দিয়ে আমি ভোট দেই। আমার মতামত নেই, শুধু একটা নম্বর।
আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স নম্বর আছে। পুলিশ আমাকে থামিয়ে নম্বর চায়। আমার চেহারা চায় না।
আমার পাসপোর্ট নম্বর আছে। বিদেশে গেলে সেই নম্বরই আমার পরিচয়। কেউ জানে না আমি কী ভাবি, কী স্বপ্ন দেখি।
আমার ইনশিউরেন্স পলিসি নম্বর আছে। আমি যদি মারা যাই, সেই নম্বর দিয়েই টাকা পাওয়া যাবে।
আমার ট্যাক্স রিটার্ন নম্বর আছে। সরকারের কাছে আমি সেই নম্বর।
রাতে ঘুমানোর আগে ভাবি, আমি কতগুলো নম্বরের সমষ্টি। এই নম্বরগুলো মিলেই তৈরি হয়েছে হায়দার।
কিন্তু আসল হায়দার কোথায়? যে ভালোবাসে, যে কষ্ট পায়, যে স্বপ্ন দেখে – সেই হায়দার কোন নম্বরে?
হয়তো সেই হায়দারের জন্য কোনো নম্বর নেই। তাই সে এই সিস্টেমে অদৃশ্য।
আর আমি শুধু নম্বরের সমষ্টি হয়ে বেঁচে আছি।
একটু ভাবনা রেখে যান