ব্লগ

ল্যাবরেটরিতে মানুষ পরীক্ষা

নভেম্বর ২০২৫ · 8 মিনিটে পড়া
শেয়ার

পরীক্ষা নং ১: মুখোশের রসায়ন

সকাল নয়টা। অফিস ল্যাবরেটরিতে প্রবেশ। আজ পরীক্ষা করব – একজন মানুষ কত মিনিটে অন্য মানুষে রূপান্তরিত হয়।

প্রথম নমুনা: আমি। হায়দার। পরীক্ষার আগে বৈশিষ্ট্য – হাসি স্বাভাবিক, চোখে সততা, কণ্ঠে আন্তরিকতা।

লিফটে উঠতেই প্রথম রাসায়নিক বিক্রিয়া:

সাহেব আমার পাশে। গতকাল যিনি আমার ফাইল নিয়ে চিৎকার করেছিলেন। আজ হাসছেন। “কেমন আছ হায়দার ভাই?”

আমার মুখে তৎক্ষণাত একটা কৃত্রিম হাসি ফুটে ওঠে। পরীক্ষার ফলাফল: ০.০৩ সেকেন্ড।

ইয়ুংয়ের পারসোনা তত্ত্ব, অচেতন থেকে ভেসে আসে: “প্রতিটি মানুষ সমাজে একটি মুখোশ পরে। কিন্তু মুখোশ কি মুখ হয়ে যায়?”

আমার ভবিষ্যৎ সত্তার কণ্ঠ, ২০৩০ সাল থেকে: “হায়দার, তুমি কি জানতে যে তোমার হাসিটা নকল?”

পরীক্ষা নং ২: ক্ষমতার কণা পদার্থবিজ্ঞান

দশটা বেজে পনেরো মিনিট। কনফারেন্স রুমে সিটিং অ্যারেঞ্জমেন্ট দেখছি। এখানে পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম কাজ করে না। এখানে ক্ষমতার নিয়ম।

ডিএমডি সাহেবের আসন: টেবিলের মাথায়। মহাকর্ষীয় কেন্দ্র। আমার আসন: দেয়ালের পাশে। অদৃশ্যতার অঞ্চল।

বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ: ক্ষমতা একটি অদৃশ্য গ্যাস। এটি ঘরে ঢুকে মানুষের আচরণ পরিবর্তন করে।

মিটিং শুরুর পূর্বে সবার আচরণ:

ডিএমডি প্রবেশের ০.১ সেকেন্ড পর:

ফুকোর কণ্ঠ, ক্ষমতা-জ্ঞানের তত্ত্ব থেকে: “ক্ষমতা শুধু দমন করে না, তৈরিও করে। তৈরি করে নতুন মানুষ।”

আমার প্রত্যুত্তর: “কিন্তু এই নতুন মানুষগুলো আসল, নাকি নকল?”

পরীক্ষা নং ৩: বন্ধুত্বের ক্ষয়প্রাপ্তি

দুপুর একটা। টিফিন রুমে রফিক ভাইয়ের সাথে। গত বছর পর্যন্ত আমরা একই পদে। এখন উনি সিনিয়র অফিসার।

পরীক্ষাপূর্ব রফিক ভাই (স্মৃতি, ২০২৩): “ইশ হায়দার, কী যে অবস্থা। বসরা নিয়ে আমাদের কী যে ভোগান্তি।”

পরীক্ষাপরবর্তী রফিক ভাই (বর্তমান): “হ্যালো হায়দার। ভালো আছ তো? আজকের ফাইলটা কিন্তু তাড়াতাড়ি করে দিতে হবে।”

এক বছরে রাসায়নিক পরিবর্তন:

আরিস্তোতলের কণ্ঠ, নিকোমেকিয়ান এথিক্স থেকে: “বন্ধুত্ব তিন প্রকার: উপকারের, আনন্দের, এবং গুণের। অফিসে কোনটি থাকে?”

আমার তিক্ত উপলব্ধি: “অফিসে চতুর্থ ধরনের বন্ধুত্ব – সুবিধার।”

পরীক্ষা নং ৪: ভালোবাসার জেনেটিক মিউটেশন

বিকেল তিনটা। নতুন সহকর্মী রিনা। প্রথম দিন এসেছে। চোখে স্বপ্ন, মুখে আগ্রহ।

আমার ভবিষ্যৎ ভবিষ্যদ্বাণী (মনে মনে): “ছয় মাস পর তোমার চোখে কী থাকবে, রিনা?”

রিনার বর্তমান কোড:

আমার মনোবিজ্ঞানী সত্তার পূর্বাভাস:

তিন মাস পর রিনার কোড:

ছয় মাস পর:

ডারউইনের কণ্ঠ, বিবর্তনের তত্ত্ব থেকে: “যে পরিবেশে টিকে থাকতে হয়, সেই পরিবেশের মতো হয়ে যেতে হয়।”

আমার প্রশ্ন: “কিন্তু মানুষ কি পরিবেশ, নাকি পরিবেশ মানুষ?”

পরীক্ষা নং ৫: গুজবের কোয়ান্টাম মেকানিক্স

বিকেল সাড়ে চারটা। ওয়াশরুমে শুনলাম – “শুনেছ? করিম সাহেব নাকি পদোন্নতি পাচ্ছেন।”

গুজবের কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্য:

দশ মিনিট পর টিফিন রুমে: “করিম সাহেব নিশ্চিত পদোন্নতি পাচ্ছেন।”

পনেরো মিনিট পর একাউন্টে: “করিম সাহেব পদোন্নতি পেয়েছেন।”

বিশ মিনিট পর আমার টেবিলে: “তুমি জানো না? করিম সাহেবের পদোন্নতি হয়ে গেছে। এক সপ্তাহ হলো।”

হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি, প্রয়োগ করলে: “অফিসে সত্য এবং সময় একসাথে নির্ধারণ করা যায় না।”

পরীক্ষা নং ৬: আমার নিজের বিকৃতি পরিমাপ

সন্ধ্যা ছয়টা। বাড়ি ফেরার পথে আয়নায় নিজেকে দেখি।

প্রাথমিক অবজার্ভেশন: সকালে যে মানুষটি ঘর থেকে বেরিয়েছিল, সে আর নেই।

বর্তমান মুখের ম্যাপিং:

আমার স্ত্রী হ্যাপির পর্যবেক্ষণ, বাড়ি পৌঁছে: “তুমি আজকাল অন্যরকম হয়ে যাচ্ছ। অফিসে কী হয় তোমার সাথে?”

আমার আত্মবিশ্লেষণ: “আমি জানি না। আমি প্রতিদিন অফিসে যাই হায়দার হয়ে। ফিরি অন্য কেউ হয়ে।”

আরাশের নির্দোষ প্রশ্ন: “বাবা, তুমি কেন অফিসে গেলে ভিন্ন মানুষ হয়ে যাও?”

আমার কাছে উত্তর নেই।

পরীক্ষা নং ৭: প্রতিরোধের সম্ভাবনা

রাত এগারোটা। আমি ভাবছি – এই ল্যাবরেটরিতে কি প্রতিরোধ সম্ভব?

হিপোক্রিটিক ওথের কথা মনে পড়ে: “প্রথমত, ক্ষতি করো না।”

কিন্তু এই অফিস ল্যাবরেটরিতে প্রতিদিন ক্ষতি হচ্ছে:

আলবের্ট কামুর কণ্ঠ, দ্য প্লেগ থেকে: “পৃথিবীতে প্লেগের চেয়ে বেশি আছে মানুষের হৃদয়ে প্লেগ।”

আমার প্রশ্ন: “অফিসের প্লেগ কী? ক্ষমতা? নাকি ভয়?”

পরীক্ষা নং ৮: নৈতিকতার হাফ-লাইফ

তেজস্ক্রিয় নৈতিকতার ক্ষয়:

প্রথম সপ্তাহ: “আমি কখনো মিথ্যা বলব না।” প্রথম মাস: “ছোট মিথ্যা তো সবাই বলে।” তৃতীয় মাস: “মিথ্যা নয়, এটা কূটনীতি।” ছয় মাস: “সত্য বলার সঠিক সময় আছে।” এক বছর: “আমি যা বলি, সেটাই সত্য। এই প্রসঙ্গে।”

নৈতিকতার হাফ-লাইফ: তিন মাস।

নিৎশের কণ্ঠ, বিয়ন্ড গুড অ্যান্ড ইভিল থেকে: “যে অতল গহ্বরের দিকে তাকায়, সেই অতল গহ্বরও তার দিকে তাকায়।”

আমার অনুভূতি: “আমি অফিসের দিকে তাকিয়েছি বেশিদিন। এখন অফিস আমার দিকে তাকিয়ে আছে।”

চূড়ান্ত পরীক্ষা: মানুষত্বের স্থায়িত্ব

প্রশ্ন: একজন মানুষ কতদিন অফিসে থাকলে মানুষ থাকে না?

পরীক্ষামূলক ফলাফল (আমার নিজের উপর):

আমার বর্তমান অবস্থা (দশম বছর):

ক্রিটিক্যাল পয়েন্ট: ১০% মানুষত্ব। এর নিচে অপরিবর্তনীয়।

পরীক্ষার উপসংহার: প্রতিরোধের ফর্মুলা

ল্যাবরেটরি থেকে পালানোর একমাত্র উপায়:

প্রতিদিন সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করা: “আমি কে?” প্রতিদিন রাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করা: “আমি কী হয়েছি?”

যদি দুটো উত্তর আলাদা হয়, তাহলে বিপদ।

যদি দুটো উত্তর একই হয়, তাহলে হয় আমি সম্পূর্ণ বিকৃত, অথবা সম্পূর্ণ সুরক্ষিত।

আমার নিজের উদ্ধার প্রকল্প

আজ রাতে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি এই ল্যাবরেটরিতে থাকব, কিন্তু পরীক্ষার বিষয় হব না। আমি হব পর্যবেক্ষক।

প্রতিদিনের প্রতিরোধ:

এবং এই লাইনটি আমার দৈনন্দিন মন্ত্র:

“আমি অফিসে কাজ করি, অফিস আমার ভেতর কাজ করে না।”

ল্যাবরেটরি থেকে আমার চূড়ান্ত রিপোর্ট:

মানুষের সম্পর্কের বিকৃতি একটি স্বতঃক্রিয় প্রক্রিয়া নয়। এটি একটি পছন্দ। প্রতিদিনের অগণিত ছোট ছোট পছন্দ।

আমি বেছে নিয়েছি – পরীক্ষার বিষয় নয়, পরীক্ষক হয়ে থাকব।

পরীক্ষা শেষ। কিন্তু সচেতনতা শুরু।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *