ব্লগ

মানুষের ভিড়ে নিজেকে অদৃশ্য মনে হওয়া

নভেম্বর ২০২৫ · 5 মিনিটে পড়া
শেয়ার

শুক্রবারের জুমার নামাজের পর মসজিদের বাইরে হাজার মানুষের ভিড়ে দাঁড়িয়ে হঠাৎ অনুভব করলাম আমি সম্পূর্ণ অদৃশ্য। এত মানুষের মাঝে আমি একা। কেউ আমাকে দেখছে না। কেউ আমার অস্তিত্ব টের পাচ্ছে না। যেন আমি একটা ভূত হয়ে এই ভিড়ের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছি।

চারদিকে মানুষ। কিন্তু কেউ আমার দিকে তাকাচ্ছে না। সবাই নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। নিজেদের কথা বলছে। নিজেদের ফোনে কথা বলছে। আমি যেন বাতাসের মতো। আছি, কিন্তু কেউ অনুভব করে না।

আমি একটা পরীক্ষা করলাম। জোরে কাশি দিলাম। কেউ তাকাল না। হাত নেড়ে দেখলাম। কেউ সাড়া দিল না। যেন আমি আসলেই অদৃশ্য।

এই অদৃশ্যতা শুধু জুমার নামাজে নয়। সব জায়গায়। অফিসে, বাসে, বাজারে। সর্বত্র আমি অদৃশ্য। মানুষ আমাকে দেখে কিন্তু লক্ষ্য করে না। আমি তাদের দৃষ্টিতে একটা বস্তু মাত্র।

বাসে উঠলে কেউ আমাকে জায়গা দেয় না। না দেয় কারণ তারা আমাকে দেখে না। আমি অদৃশ্য। বাজারে গেলে দোকানদার দেরিতে সার্ভিস দেয়। কারণ আমি তার চোখে গুরুত্বপূর্ণ কাস্টমার নই। আমি একটা সাধারণ ক্রেতা।

অফিসে আমার কলিগরা আমার সামনে দিয়ে হেঁটে যায়। সালাম দেয় না। কথা বলে না। যেন আমি নেই। আমার মতামত চায় না। আমার উপস্থিতি অনুভব করে না।

এই অদৃশ্যতার সবচেয়ে কষ্টকর দিক হলো, আমি চাইলেও নিজেকে দৃশ্যমান করতে পারি না। আমি জোরে কথা বললে মানুষ বিরক্ত হয়। আমি নিজেকে প্রকাশ করতে চাইলে লোকে অস্বস্তি বোধ করে।

তাই আমি আরও অদৃশ্য হয়ে যাই। আরও চুপ হয়ে যাই। আরও সরে যাই।

হ্যাপির বান্ধবীদের সাথে দেখা হলে তারা আমাকে এমনভাবে দেখে যেন আমি একটা আসবাবপত্র। আছি, কিন্তু কোনো গুরুত্ব নেই। তারা হ্যাপির সাথে কথা বলে। আমার সাথে বলে না।

আরাশের বন্ধুদের বাবারা আমার সাথে কথা বলে না। তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলে। আমি পাশে দাঁড়িয়ে থাকি। কিন্তু আমার অস্তিত্ব তারা স্বীকার করে না।

আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, “হে আল্লাহ, আমি কি তোমার কাছেও অদৃশ্য?” কিন্তু মনে হয় আল্লাহর কাছে আমি দৃশ্যমান। উনি আমাকে দেখেন। শুধু মানুষ দেখে না।

এই অদৃশ্যতা কখন শুরু হয়েছিল জানি না। হয়তো যেদিন থেকে আমি নিজেকে অগুরুত্বপূর্ণ মনে করতে শুরু করেছি। হয়তো যেদিন থেকে আমি ভাবতে শুরু করেছি আমি কিছুই না।

অথবা সমাজই এমন যে সাধারণ মানুষদের অদৃশ্য করে রাখে। আমরা যারা গরিব, যাদের কোনো প্রভাব নেই, আমরা অদৃশ্য।

আমার কোনো ক্ষমতা নেই। কোনো টাকা-পয়সা নেই। কোনো প্রভাব নেই। তাই আমি অদৃশ্য।

মাঝে মাঝে মনে হয় এই অদৃশ্যতাই আমার পরিচয়। আমি অদৃশ্য মানুষ। যে আছে কিন্তু নেই। যাকে দেখা যায় কিন্তু লক্ষ্য করা যায় না।

কিন্তু সবচেয়ে কষ্টের কথা হলো, আমি নিজেও নিজেকে অদৃশ্য মনে করি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয় কোনো প্রতিবিম্ব নেই। আমি অদৃশ্য।

হ্যাপি মাঝে মাঝে বলে, “তুমি কেন এত চুপচাপ?” আমি বলি, “কী বলব?” কিন্তু আসল কথা হলো আমি জানি কেউ শুনবে না। আমি অদৃশ্য মানুষের কথা কেউ শোনে না।

আরাশ বলে, “আব্বু, আপনি কেন সবার পেছনে থাকেন?” আমি বলি, “এমনিই।” কিন্তু সত্য হলো আমি জানি সামনে দাঁড়ালেও কেউ দেখবে না। তাই পেছনে থাকি।

এই অদৃশ্যতা আমার চরিত্রের অংশ হয়ে গেছে। আমি যেখানে যাই, অদৃশ্য হয়ে যাই। যা করি, লক্ষ্য করা হয় না। যা বলি, শোনা হয় না।

আমি একটা অদৃশ্য জীবন যাপন করছি। অদৃশ্য মানুষের অদৃশ্য সংগ্রাম। অদৃশ্য কষ্ট। অদৃশ্য স্বপ্ন।

রাতে ঘুমানোর আগে ভাবি, আগামীকাল আবার অদৃশ্য হয়ে বের হব। আবার মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যাব।

কিন্তু এই অদৃশ্যতার মধ্যেও একটা স্বাধীনতা আছে। কেউ আমাকে দেখে না বলে আমার উপর কোনো চাপ নেই। আমি নিজের মতো থাকতে পারি।

হয়তো এই অদৃশ্যতাই আমার শক্তি। আমি অদৃশ্য বলে আমি সবকিছু দেখতে পাই। সবার ভণিতা, সবার মুখোশ।

আমি অদৃশ্য সাক্ষী। মানুষের সমাজের অদৃশ্য পর্যবেক্ষক।

আর এই ভূমিকাতেই হয়তো আমার জীবনের অর্থ লুকিয়ে আছে। অদৃশ্য হয়ে দৃশ্যমান সত্য দেখা।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *