
সে এসেছিল।
এটুকুই শুরু।
কোনো ঢাকঢোল নেই। কোনো বড় ঘোষণা নেই। একটা মেয়ে একটা বাড়িতে ঢুকেছে — এটুকুই।
কিন্তু সেই ঢোকার মধ্যে সব আছে। তার পুরো জীবন আছে। সে জানত না। কেউ জানে না আসলে। কোনো মেয়েই জানে না — যে দরজাটা সে পার হচ্ছে, সেই দরজার ওপাশে কী।
সে পার হয়েছিল।
বাড়িটা ভাঙা দেখাত না।
দরজা আছে। রং করা। জানালায় পর্দা। বাড়ির সামনে একটা গাছ — কোন গাছ মনে নেই এখন, কিন্তু গাছ ছিল। বাইরে থেকে মনে হতো — এখানে মানুষ আছে, সংসার আছে, জীবন আছে।
কিন্তু ভেতরে একটা ক্লান্তি।
সেই ক্লান্তি দেয়ালে মিশে গেছে। রান্নাঘরের কালো ছাদে আছে। পুরনো চাদরের গন্ধে আছে। বাতাসে আছে।
সে এই বাতাসে ঢুকেছিল।
টের পেয়েছিল কিনা জানি না।
কিছু বলেনি।
পরদিন সকালে উঠে রান্নাঘরে গেছে। চুলা জ্বেলেছে। ধোঁয়া উঠেছে। চা হয়েছে।
এটাই তার প্রথম দিন।
একটা মেয়ে বিয়ের আগে কিছু না কিছু স্বপ্ন দেখে।
সে কী দেখেছিল জানি না। জিজ্ঞেস করিনি কখনো। এই না জিজ্ঞেস করাটা আমার একটা ব্যর্থতা।
কিন্তু যে বাড়িতে এলো, সেখানে স্বপ্নের আগেই কাজ।
শাশুড়ি বিছানায়। শরীর নিজে সামলাতে পারেন না। পায়খানা, পেশাব — সব বিছানায়। গন্ধ আছে। কষ্ট আছে। লজ্জা আছে।
সে গেল।
কেউ পাঠায়নি। কেউ বলেনি। নিজে গেল।
প্রতিদিন সকালে উঠত।
এটা সহজ কথা না।
প্রতিদিন মানে — রোদ থাকুক, বৃষ্টি থাকুক, শরীর ভালো না থাকুক, মন ভালো না থাকুক, রাতে ঘুম না হোক — প্রতিদিন।
সেই ঘরে যেত। দরজা খুলত। গন্ধটা আগে লাগত। তারপর সয়ে যেত।
গরম পানি আনত। ছোট গামলায়। হাত দিয়ে মাপত — বেশি গরম হলে লাগবে, ঠান্ডা হলে কষ্ট পাবেন।
শাশুড়ির শরীর মুছত।
পুরনো কাপড় সরাত। নতুন পরাত। বিছানার চাদর বদলাত।
তারপর রান্নাঘর। তারপর ছেলে। তারপর সংসারের বাকি সব।
তারপর রাত।
তারপর আবার সকাল।
এই ছিল তার দিন। প্রতিটা দিন। মাসের পর মাস। বছরের পর বছর।
কেউ দেখত না।
এটা ছোট কথা না।
মানুষ যখন কিছু করে, ভেতরে একটু চায় — কেউ দেখুক। একটু — তুমি ভালো করছ।
কেউ বলেনি।
আমিও বলিনি।
সে কারো জন্য করেনি। কিন্তু কেউ না দেখলেও একটু কষ্ট হয়।
সে মানুষ।
সেও কষ্ট পেয়েছিল হয়তো।
বলেনি।
একদিন একটা ছোট বাক্স নিয়ে এলো।
খুলল।
ভেতরে গহনা। বিয়েতে পাওয়া। কখনো বিশেষ পরত না। মাঝে মাঝে বের করত, আঙুলে দিয়ে দেখত, আবার রেখে দিত।
বলল — নাও। দরকার।
আমি বললাম — না।
সে বলল — নাও।
আমি নিইনি।
কিন্তু সে যে বাক্সটা খুলেছিল — সেই মুহূর্তটা এখনো চোখে আছে।
একটা মেয়ের গহনা শুধু ধাতু না। সেটা তার। পৃথিবীতে একটাই জিনিস যেটা সম্পূর্ণ তার নিজের।
সে সেটা বাড়িয়ে দিয়েছিল।
নিজের শেষ জিনিসটা।
এটা ভালোবাসা। কিন্তু এটা একটা ট্র্যাজেডিও। কারণ যে মানুষ এত সহজে নিজেকে দিয়ে দেয় — সে নিজেকে কতটুকু ভালোবাসে?
ছেলে জন্মাল।
পৃথিবীতে যখন একটা নতুন মানুষ আসে, মা শুধু দেখে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ঘুমন্ত মুখ। নিঃশ্বাস। আঙুল গোনে। এই সময়টা কোনো মায়ের কাছ থেকে নেওয়ার কথা না।
সে পেয়েছিল কি সেই সময়?
সেই ঘর আছে। সেই কাজ আছে। শাশুড়ি আছেন।
ছেলে কোল চেয়ে কাঁদে।
সে পারত না সবসময় যেতে।
এই কথাটা লেখার সময় হাত থামে।
কোনো মা চায় না — ছেলে কাঁদবে আর সে যেতে পারবে না। কিন্তু শরীর একটা। সময় একটা।
সে কোথায় থাকত বেশিরভাগ সময়?
সেই ঘরে।
ছেলে বড় হয়েছে। কিন্তু মায়ের কোলে কতটুকু সময় পেয়েছে — এই হিসাব মাঝে মাঝে করি। তারপর বন্ধ করি।
কারণ এই হিসাবের শেষ নেই।
তারপর সেই দিন।
তার মায়ের খবর — ভয়ানক অসুস্থ। বাঁচবেন না বেশিদিন।
সে শুনল।
চুপ করে রইল কিছুক্ষণ।
তার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। কী ছিল সেখানে বলতে পারব না। একটা ভার যেটা মুখ দিয়ে বের হচ্ছে না। ভেতরে কী হচ্ছিল শুধু সে জানত।
সে উঠল।
ছেলেকে গুছিয়ে নিল। ব্যাগ গোছাল।
যাওয়ার আগে শাশুড়ির জন্য কাউকে ঠিক করে গেল। নিশ্চিত করে গেল — উনি যেন কষ্ট না পান।
একবার ভাবো।
নিজের মরণাপন্ন মায়ের কাছে যাওয়ার আগে সে নিশ্চিত করে গেল অন্যের মা যেন কষ্ট না পায়।
এটা কী?
এটা কোনো বইয়ে নেই। শেখানো যায় না। কেউ শেখাতে পারে না।
এটা শুধু — সে।
সে মায়ের কাছে গেল।
কিছুদিন পেল।
মায়ের পাশে বসল। হাত ধরল। সেই হাত — যে হাত ছোটবেলায় মাথায় বুলিয়ে দিত। যে হাতের ছোঁয়ায় জ্বর কমে যেত। যে হাতের রান্না পৃথিবীর সেরা লাগত।
সেই হাত ধরল।
তারপর ফিরে আসতে হলো।
কারণ এখানে কেউ আছে।
সে ফিরে এলো।
কিছুদিন পর খবর — তার মা নেই।
মা শেষ নিঃশ্বাসে মেয়ের হাত পাননি।
সেই হাত তখন এখানে।
অন্য কারো জন্য।
রাতে কেঁদেছিল।
আমি দেখেছি।
কিছু বলিনি।
কী বলব?
“সরি” বললে কী হবে? “তোমার দোষ নেই” বললে কী হবে? এই কথাগুলো শুধু বলা মানুষটাকে হালকা করে। যার কষ্ট, তার কষ্ট থাকেই।
মা গেছেন।
এই শূন্যতা ভরার কিছু নেই।
কিন্তু পরদিন সকালে উঠেছিল।
যে মানুষ মায়ের মৃত্যুর পরদিন উঠে চুলা জ্বালায় — সে কতটা শক্ত, নাকি কতটা একা — বলা মুশকিল।
হয়তো দুটোই।
ছেলেকে ডেকেছিল। রান্না করেছিল। হেসেছিল।
এই হাসিটা দেখলে বুকে কিছু একটা হয়।
এটা সাহস না। দুর্বলতা না।
এটা শুধু — সে যেভাবে বেঁচে থাকে।
একদিন ছেলে জিজ্ঞেস করেছিল — মা, তুমি কাঁদো কেন?
সে বলেছিল — কাঁদি না তো।
ছেলে বলেছিল — আমি দেখেছি।
সে চুপ।
ছেলে বলেছিল — আমি পাশে থাকব।
সে জড়িয়ে ধরেছিল।
অনেকক্ষণ।
ছেড়ে দিতে পারছিল না।
সেই জড়িয়ে ধরার মধ্যে কী?
মায়ের গন্ধ — যেটা আর পাবে না।
নিজের মেয়েবেলা — যেটা কোথাও হারিয়ে গেছে।
যে স্বপ্নগুলো দেখেছিল — বলা হয়নি কখনো।
যে কথাগুলো কাউকে বলেনি — ভেতরে ভেতরে জমে আছে।
সব একসাথে।
একটা ছোট ছেলের বুকে।
আমি তার দিকে মাঝে মাঝে তাকাই।
সে জানে না।
ভাবি — এই মানুষটা কোথা থেকে এলো? এত বহন করে কীভাবে হাসে? এত হারিয়ে কীভাবে এখনো দেয়?
উত্তর নেই।
শুধু এটুকু জানি — সে এমন একটা মানুষ যাকে পৃথিবী কখনো দেখেনি। সমাজ দেখেনি। ইতিহাস লেখেনি।
কারণ সে কোনো বড় কাজ করেনি।
শুধু প্রতিদিন উঠেছে।
শুধু থেকেছে।
এটাই তার যাত্রা।
এই যাত্রার কোনো গন্তব্য নেই।
কোনো পুরস্কার নেই। কোনো মঞ্চ নেই। কেউ বলবে না — তুমি অনেক দিয়েছ।
কেউ বলবে না।
কিন্তু একটা বাড়ি আছে।
সেই বাড়িতে একটা ছেলে আছে যে মা ডাকলে সাড়া পায়।
সেই বাড়িতে প্রতিদিন সকালে চুলা জ্বলে।
সেই বাড়িতে একটা মানুষ আছে যে ভেতরে অনেক কিছু বহন করছে — কিন্তু প্রতিদিন উঠছে।
সে এসেছিল একটা ভাঙা বাড়িতে।
বাড়িটা এখনো পুরোপুরি ঠিক হয়নি।
কিন্তু সে আছে।
এখনো আছে।
এটাই যথেষ্ট।
এটাই সব।

একটু ভাবনা রেখে যান