এটিএম বুথে দাঁড়িয়ে কার্ড ঢুকালাম। পিন নাম্বার টিপলাম। স্ক্রিনে লেখা “অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন।”
অপেক্ষা। সারা মাস অপেক্ষা করেছি এই দিনের জন্য।
“লেনদেন সফল হয়েছে।” মেশিন টাকা বের করল। তিরিশ হাজার টাকা। পাতলা কাগজ। কিন্তু এই কাগজে আমার পুরো মাসের স্বপ্ন।
হাতে টাকা নিয়ে ভালো লাগল। অনেক দিন পর ভালো লাগল।
কিন্তু এই ভালো লাগা কতক্ষণ থাকবে? এক ঘণ্টা? দুই ঘণ্টা?
বাড়ি ভাড়া পনেরো হাজার। দোকানের বাকি দশ হাজার। আরাশের স্কুলের বেতন তিন হাজার। মিলিয়ে আটাশ হাজার। থাকল দুই হাজার। পুরো মাসের জন্য দুই হাজার।
রাস্তায় হাঁটতে লাগলাম। টাকার গন্ধ পাচ্ছি। নতুন টাকার গন্ধ। ভালো গন্ধ।
একটা মিষ্টির দোকান। আরাশের খুব পছন্দ রসগোল্লা। ইচ্ছে করছে কিনতে। এক কেজি রসগোল্লা। কিন্তু দাম দেখে থেমে গেলাম। ছয়শো টাকা।
পাশেই একটা কাপড়ের দোকান। হ্যাপির শাড়ি দরকার। পুরনো শাড়িগুলো ছিঁড়ে গেছে। কিন্তু একটা শাড়ির দাম তিন হাজার। আমার কাছে দুই হাজার।
আরেকটা দোকান। আরাশের জুতা। স্কুলের জুতা ছিঁড়ে গেছে। নতুন জুতার দাম দেড় হাজার।
প্রতিটা দোকানে থামছি। প্রতিটা দোকান থেকে ফিরে আসছি। কিছুই কিনতে পারছি না।
বাড়ি এসে টাকাগুলো টেবিলে রাখলাম। হ্যাপি গুনে দেখল।
“এবার কী কী দিতে হবে?” হ্যাপি জিজ্ঞেস করল।
“বাড়ি ভাড়া, দোকানের বাকি, আরাশের স্কুলের বেতন।”
হ্যাপি চুপ হয়ে গেল। হিসাব করল মনে মনে।
“আর কিছু কিনতে পারব না?” আরাশ জিজ্ঞেস করল।
“পরের মাসে।” বললাম।
সেই একই কথা। পরের মাসে। প্রতি মাসে পরের মাসে।
সন্ধ্যায় দোকানে গেলাম। দোকানদার খুশি। আমার টাকা দেখে তার চোখ চকচক করছে।
“আজকে সব দিয়ে দেব?” দোকানদার জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ।” বললাম।
টাকা গুনে দিলাম। দোকানদার খাতা থেকে আমার নাম কেটে দিল। এক মাসের জন্য আমি মুক্ত। এক মাসের জন্য ঋণমুক্ত।
বাড়ি ভাড়া, স্কুলের বেতন সব দিয়ে এলাম। হাতে থাকল পাঁচশো টাকা।
রাতে বিছানায় শুয়ে ভাবলাম। আজ সকালে হাতে ছিল তিরিশ হাজার। এখন পাঁচশো। এক দিনে ঊনত্রিশ হাজার পাঁচশো টাকা কোথায় গেল?
কিছুই তো কিনিনি। কোনো বিলাসিতা করিনি। শুধু বেঁচে থাকার খরচ। তাহলে জীবন এতো দামী কেন?
আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহেই আবার শুরু হবে। দোকানদারের মুখ দেখা। “একটু অপেক্ষা করবেন?” বলা। মাথা নিচু করে হাঁটা।
এভাবে কত বছর? সারাজীবন? মাসের শুরুতে ঋণ, মাসের শেষে পরিশোধ। এই চক্রের কোনো শেষ নেই।
তবু আজকের ভালো লাগাটুকু ছিল। এক দিনের জন্য হলেও টাকা ছিল হাতে। এক দিনের জন্য হলেও মনে হয়েছিল আমি সক্ষম।
কাল আবার শুরু হবে অপেক্ষা। আরেক মাসের অপেক্ষা।
একটু ভাবনা রেখে যান