মাথা ব্যথা হলে মা বলতেন, “প্যারাসিটামল খাও।” জ্বর হলে প্যারাসিটামল। পেট ব্যথা হলে প্যারাসিটামল। এমনকি মন খারাপ হলেও মায়ের প্রথম সমাধান ছিল সেই একই সাদা ট্যাবলেট। যেন প্যারাসিটামল শুধু একটা ওষুধ নয়, একটা মহৌষধ।
আজ আরাশের জ্বর। হ্যাপি বলছে, “ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে।” কিন্তু আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, “আগে একটা প্যারাসিটামল দে।” হ্যাপি অবাক হয়ে তাকাল। “তুমি তো ডাক্তার না।” আমি বুঝলাম, আমি মায়ের কণ্ঠস্বর হয়ে গেছি।
ছোটবেলায় যখন কোনো অসুখ হত, প্রথমেই মায়ের কাছে যেতাম। তিনি কপালে হাত দিয়ে তাপমাত্রা দেখতেন। তারপর বলতেন, “প্যারাসিটামল খা। সেরে যাবে।” এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেরে যেত। কিন্তু সেটা কি প্যারাসিটামলের কারণে, নাকি মায়ের আত্মবিশ্বাসের কারণে?
মা কখনো ওষুধের নাম মনে রাখতে পারতেন না। প্যারাসিটামল বলতেন “প্যারাসিট”, কখনো “প্যারাটামল”। কিন্তু সেই ভুল উচ্চারণেও একটা আশ্বাসের সুর ছিল। মনে হত, মা বলছে মানে নিশ্চয়ই ঠিক।
আমাদের ঘরে সব সময় প্যারাসিটামলের একটা পুরনো কৌটা থাকত। সেই কৌটায় বিভিন্ন কোম্পানির প্যারাসিটামল থাকত। নাপা, এস্কেপ, আরো কত নাম। কিন্তু মায়ের কাছে সবই “প্যারাসিটামল”। কোনো পার্থক্য নেই।
একবার আমার ভয়ানক পেট ব্যথা। কুঁকড়ে পড়ে আছি। মা এসে বললেন, “প্যারাসিটামল খা।” আমি বললাম, “মা, এটা তো পেট ব্যথার ওষুধ না।” মা বললেন, “সব ব্যথারই ওষুধ।” এই আত্মবিশ্বাসের কাছে আমি হার মানলাম।
বয়স বাড়ার সাথে সাথে বুঝেছি যে প্যারাসিটামল আসলেই অনেক কাজের ওষুধ। জ্বর কমায়, ব্যথা কমায়। কিন্তু মায়ের কাছে এটা আরো বেশি কিছু ছিল। এটা ছিল তার ভালোবাসার প্রকাশ।
যখন অসুস্থ হতাম, মা শুধু প্যারাসিটামল দিয়েই ক্ষান্ত থাকতেন না। কপালে পানি দিতেন। গল্প বলতেন। পাশে বসে থাকতেন। হয়তো প্যারাসিটামলের চেয়ে এই সেবাটাই বেশি কাজ করত।
এখন আরাশ অসুস্থ হলে আমিও বলি, “প্যারাসিটামল খা।” হ্যাপি হাসে। বলে, “তুমি তোমার মায়ের মতো হয়ে যাচ্ছ।” আমি বুঝি এটা একটা ভালো জিনিস। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এভাবেই চিকিৎসার ঐতিহ্য চলে যায়।
আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি যে মায়ের দেওয়া এই সহজ সমাধানগুলো আজও কাজ করে। জটিল জীবনে সহজ উত্তরের যে আশ্বাস, সেটা আমি আমার সন্তানের কাছে পৌঁছে দিতে পারছি।
কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয়, প্যারাসিটামল শুধু একটা ওষুধ না। এটা মায়ের ভালোবাসার একটা প্রতীক। যখন আর কিছু জানা নেই, যখন কিছু করার নেই, তখন অন্তত প্যারাসিটামল দেওয়া যায়। অন্তত কিছু একটা করা হচ্ছে।
আজ রাতে আরাশের জ্বর কমেছে। হয়তো প্যারাসিটামলের কারণে। হয়তো আমাদের যত্নের কারণে। কিন্তু আমি জানি, মা বেঁচে থাকলে বলতেন, “দেখেছিস? প্যারাসিটামল খেলে সব ঠিক হয়ে যায়।”
এবং হয়তো তিনি ঠিকই বলতেন। কারণ কিছু ওষুধ শরীর সারায়, কিছু ওষুধ মন সারায়। মায়ের প্যারাসিটামল দুটোই করত।
আগামীকাল আরাশ সুস্থ হয়ে স্কুল যাবে। আর আমি বুঝব যে মায়ের সেই পুরনো ফর্মুলা আজও কাজ করে। সব সমস্যার সমাধান হয়তো প্যারাসিটামলে নেই, কিন্তু সব ভালোবাসার একটা অংশ নিশ্চয়ই আছে।
একটু ভাবনা রেখে যান