ব্লগ

যে মিটিং হয় পরবর্তী মিটিং এর সময় ঠিক করার জন্য

নভেম্বর ২০২৫ · 8 মিনিটে পড়া
শেয়ার

মিটিং

একটি কাল্পনিক গল্প


সেলিম সাহেব একদিন আবিষ্কার করলেন তিনি একটা মিটিংয়ের ভেতরে জন্মেছেন এবং সম্ভবত মিটিংয়ের ভেতরেই মারা যাবেন।


ঘটনাটা এভাবে শুরু হয়নি।

শুরুতে সেলিম সাহেব ছিলেন একজন সাধারণ মানুষ। সকালে অফিসে যেতেন, বিকেলে ফিরতেন। মাঝখানে কিছু কাজ করতেন। জীবন সুন্দর ছিল।

তারপর একদিন একটা চিঠি এলো। “জরুরি মিটিং — আগামীকাল সকাল ১০টা।”

সেলিম সাহেব গেলেন।

সেই যে গেলেন, আর ফেরেননি।


প্রথম মিটিংটা ছিল নির্দোষ। বিষয়: অফিসের নতুন প্রিন্টার কেনা। সাতজন মানুষ বসলেন। দুই ঘণ্টা আলোচনা হলো। শেষে সিদ্ধান্ত হলো — এই বিষয়ে আরেকটা মিটিং দরকার।

দ্বিতীয় মিটিংয়ে এগারোজন এলেন। কারণ প্রিন্টার কেনার আগে বাজেট কমিটির অনুমোদন লাগবে। বাজেট কমিটির মিটিং হবে পরের সপ্তাহে।

পরের সপ্তাহে বাজেট কমিটি বসলো। তারা বললো, আগে জানতে হবে কোন ব্র্যান্ডের প্রিন্টার কিনবেন। সেটা ঠিক করার জন্য একটা টেকনিক্যাল কমিটি দরকার।

টেকনিক্যাল কমিটির মিটিং হলো। তারা বললো, প্রিন্টার কেনার আগে জানতে হবে কত মানুষ প্রিন্টার ব্যবহার করবে। সেটার জন্য একটা সার্ভে দরকার।

সার্ভে কমিটি গঠিত হলো। তাদের প্রথম মিটিংয়ে ঠিক হলো — সার্ভের প্রশ্নমালা তৈরির জন্য আরেকটা মিটিং লাগবে।

সেলিম সাহেব হিসাব করে দেখলেন, একটা প্রিন্টার কেনার জন্য এখন পর্যন্ত বারোটা মিটিং হয়েছে।

প্রিন্টার এখনো কেনা হয়নি।


ধীরে ধীরে সেলিম সাহেব বুঝতে পারলেন — মিটিং একটা জীবন্ত প্রাণী। এর জন্ম আছে, বৃদ্ধি আছে, কিন্তু মৃত্যু নেই। একটা মিটিং শেষ হলে সেটা দুটো মিটিংয়ের জন্ম দেয়। সেই দুটো চারটার। চারটা আটটার।

মিটিং বংশবিস্তার করে। জ্যামিতিক হারে।


সেলিম সাহেবের স্ত্রী রাবেয়া একদিন জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি সারাদিন কী করো?”

“মিটিং।”

“মিটিংয়ে কী হয়?”

সেলিম সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “জানো, আমি নিজেও জানি না।”

সেই রাতে ঘুম এলো না। শুয়ে শুয়ে ভাবলেন — সত্যিই তো, মিটিংয়ে কী হয়?

মানুষ আসে। বসে। কথা বলে। কিন্তু কথাগুলো বাতাসে মিলিয়ে যায়। কোনো কাজ হয় না। শুধু পরবর্তী মিটিংয়ের তারিখ ঠিক হয়।

মিটিং হলো সেই সিঁড়ি যেটায় যত ওঠা যায়, ততই নিচে নামা হয়।


অফিসে একজন নতুন কর্মী এসেছে। নাম ফাহিম। তরুণ, উদ্যমী। প্রথম মিটিংয়ে সে প্রশ্ন করলো, “আমরা কি আজকেই একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারি?”

পুরো ঘর চুপ হয়ে গেল। যেন সে অশ্লীল কিছু বলেছে।

চেয়ারম্যান সাহেব কাশলেন। “এই বিষয়ে আমরা পরবর্তী মিটিংয়ে আলোচনা করব।”

ফাহিম আর কোনোদিন প্রশ্ন করেনি।

ছয় মাস পর সেলিম সাহেব দেখলেন, ফাহিমও মিটিংয়ে ঝিমোচ্ছে। তার চোখে সেই আলো নেই। সে এখন দলের একজন।

মিটিং মানুষকে গ্রাস করে। ধীরে ধীরে। নিঃশব্দে।


একদিন সেলিম সাহেব একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলেন।

তিনি একটা বিশাল করিডোরে দাঁড়িয়ে আছেন। দুপাশে অসংখ্য দরজা। প্রতিটা দরজায় লেখা — “মিটিং রুম।”

তিনি একটা দরজা খুললেন। ভেতরে একটা মিটিং চলছে। কিন্তু মানুষগুলোর মুখ নেই। শুধু ঠোঁট আছে। ঠোঁট নড়ছে।

তিনি আরেকটা দরজা খুললেন। একই দৃশ্য।

তৃতীয়টা। চতুর্থটা। সবখানে মুখবিহীন মানুষ। ঠোঁট নড়ছে। কথা হচ্ছে। কিন্তু কেউ কাউকে শুনছে না।

ঘুম ভাঙলো ঘামে ভেজা বুকে।


সেলিম সাহেব একদিন সাহস করে চেয়ারম্যান সাহেবকে জিজ্ঞেস করলেন, “স্যার, আমাদের এত মিটিং কেন?”

চেয়ারম্যান সাহেব হাসলেন। “মিটিং ছাড়া অফিস চলে?”

“কিন্তু মিটিংয়ে তো কোনো কাজ হয় না।”

চেয়ারম্যান সাহেবের হাসি মিলিয়ে গেল। তিনি জানালার দিকে তাকালেন। অনেকক্ষণ চুপ থাকলেন।

তারপর বললেন, “সেলিম, কাজ হওয়াটা জরুরি না। কাজ হচ্ছে — এটা দেখানোটা জরুরি।”

সেলিম সাহেব বুঝলেন। মিটিং হলো সেই থিয়েটার যেখানে সবাই অভিনয় করে কর্মব্যস্ততার।


একবার হিসাব করে দেখলেন।

গত এক বছরে তিনি ১৪৪টা মিটিংয়ে গেছেন। প্রতি মিটিং গড়ে দেড় ঘণ্টা। মানে ২১৬ ঘণ্টা।

২১৬ ঘণ্টা। নয় দিন। টানা নয় দিন।

এই নয় দিনে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে? সেলিম সাহেব মনে করার চেষ্টা করলেন।

একটাও মনে পড়লো না।


রাবেয়া একদিন বললেন, “তোমাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে।”

“মিটিং ছিল।”

“কয়টা?”

“তিনটা।”

“তিনটা মিটিংয়ে কী হলো?”

সেলিম সাহেব ভাবলেন। প্রথম মিটিংয়ে ঠিক হলো দ্বিতীয় মিটিংয়ের সময়। দ্বিতীয় মিটিংয়ে ঠিক হলো তৃতীয় মিটিংয়ের এজেন্ডা। তৃতীয় মিটিংয়ে ঠিক হলো চতুর্থ মিটিং কারা অ্যাটেন্ড করবে।

“কিছু না,” বললেন।

“তাহলে মিটিং কেন?”

এই প্রশ্নের উত্তর সেলিম সাহেবের জানা নেই। হয়তো কারোই জানা নেই।

মিটিং হয় কারণ মিটিং হয়। এর বাইরে কোনো কারণ নেই।


একদিন অফিসে যেতে গিয়ে সেলিম সাহেব থমকে দাঁড়ালেন।

গেটের সামনে একটা বিশাল সাইনবোর্ড। আগে ছিল না। লেখা: “এই ভবনে প্রবেশ করলে আপনি মিটিং চক্রের অংশ হয়ে যাবেন।”

তিনি চোখ কচলালেন। আবার দেখলেন।

সাইনবোর্ড নেই। হ্যালুসিনেশন।

নাকি সত্যি ছিল?


সেলিম সাহেবের ছেলে তুহিন একদিন জিজ্ঞেস করলো, “বাবা, তুমি বড় হয়ে কী হতে চেয়েছিলে?”

প্রশ্নটা অপ্রত্যাশিত ছিল।

সেলিম সাহেব ভাবলেন। অনেকক্ষণ ভাবলেন।

মনে পড়লো — ছোটবেলায় তিনি ছবি আঁকতে ভালোবাসতেন। রঙিন পেন্সিল দিয়ে আকাশ আঁকতেন। গাছ আঁকতেন। স্বপ্ন আঁকতেন।

“শিল্পী হতে চেয়েছিলাম,” বললেন।

“তাহলে হওনি কেন?”

সেলিম সাহেব উত্তর দিতে পারলেন না।

সেই রাতে অনেকদিন পর তিনি একটা ছবি আঁকলেন। কাগজে পেন্সিলে।

একটা মানুষ আঁকলেন। যে একটা বিশাল চাকার ভেতরে দৌড়াচ্ছে। হ্যামস্টারের মতো। চাকা ঘুরছে। মানুষ দৌড়াচ্ছে। কিন্তু কোথাও পৌঁছাচ্ছে না।

ছবিটার নিচে লিখলেন — “মিটিং।”


পরের দিন অফিসে গিয়ে দেখলেন নোটিশ বোর্ডে নতুন বিজ্ঞপ্তি।

“জরুরি মিটিং — আজ বিকেল ৩টা। বিষয়: মিটিংয়ের সংখ্যা কমানো।”

সেলিম সাহেব পড়লেন। আবার পড়লেন।

মিটিংয়ের সংখ্যা কমানোর জন্য মিটিং।

তিনি হাসলেন। অথবা কাঁদলেন। তিনি নিজেও বুঝলেন না।


সেই মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হলো — মিটিং কমানোর জন্য একটা বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে। সেই কমিটি প্রতি সপ্তাহে মিটিং করবে।

সেলিম সাহেব বুঝলেন, এই চক্র থেকে বের হওয়ার কোনো পথ নেই।

কিন্তু তারপরও তিনি পরদিন অফিসে এলেন। মিটিংয়ে গেলেন। বসলেন। কথা বললেন।

কারণ তিনি জানেন — বাইরে যাওয়ার দরজা নেই। অথবা আছে, কিন্তু কেউ খোঁজে না।


রাতে শুতে যাওয়ার আগে সেলিম সাহেব জানালা দিয়ে আকাশ দেখেন।

তারাগুলো জ্বলছে। লক্ষ কোটি বছর ধরে জ্বলছে। তারা কোনো মিটিং করে না। কোনো কমিটি নেই। কোনো এজেন্ডা নেই।

তারপরও তারা জ্বলে।

সেলিম সাহেব ভাবেন — হয়তো এটাই উত্তর। কাজ করতে হলে মিটিং লাগে না। মিটিং লাগে কাজ না করতে হলে।

কিন্তু এই কথা তিনি কাউকে বলেন না।

কারণ সেটা বলতে হলে একটা মিটিং ডাকতে হবে।


[এই গল্পের সকল চরিত্র ও ঘটনা সম্পূর্ণ কাল্পনিক।]

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *