ব্লগ

কালো মেঘের নিচে

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারি না। চোখ খোলা আছে, কিন্তু শরীরটা যেন সিমেন্টের তৈরি। বিছানার চাদরটা মনে হয় একটা জালের মতো আমাকে বেঁধে রেখেছে। উঠতে হবে, জানি। কিন্তু “উঠা” বলে কোনো শব্দ নেই আমার অভিধানে আজ।

হ্যাপি এসে বলে, “উঠো, অনেক দেরি হয়ে গেছে।” তার কণ্ঠস্বর শুনতে পাই, কিন্তু মনে হয় অনেক দূর থেকে আসছে। যেন সে ১০০ ফুট গভীর একটা কুয়োর উপর দাঁড়িয়ে আর আমি নিচে পড়ে আছি।

“আজ একটু খারাপ লাগছে,” বলি। কিন্তু “খারাপ লাগা” দিয়ে এই অবস্থার নাম দেওয়া যায় না। এটা “খারাপ লাগা” নয়। এটা হচ্ছে মনে হওয়া যে আমার ভিতরে একটা কালো গর্ত তৈরি হয়েছে। সেই গর্ত সব আলো গিলে ফেলছে।

আয়নার সামনে দাঁড়াই। মুখে অদ্ভুত একটা মুখোশ পরা। মুখোশটা আমার নিজের মুখের মতোই দেখতে, কিন্তু এর চোখ দুটো কেমন ফাঁকা। যেন কেউ ভিতর থেকে সব আলো নিভিয়ে দিয়ে গেছে।

দাঁত ব্রাশ করার সময় মনে হয় – আমি কেন এটা করছি? আগামীকালও তো আবার ময়লা হবে। তাহলে পরিষ্কার করার মানে কী? সব কিছুরই তো একটা শেষ আছে। তাহলে শুরু করার মানে কী?

রাস্তায় বের হই। লোকজন হাঁটছে। তাদের সবার মুখে একটা জীবন্ত ভাব। তারা কোথাও যাচ্ছে। কিছু একটা করছে। কিন্তু আমি মনে করতে পারি না – আমি কেন বের হয়েছি। আমার গন্তব্য কী।

অফিসে পৌঁছাই। টেবিলে বসি। কম্পিউটার অন করি। কিন্তু কিবোর্ডের দিকে তাকিয়ে মনে হয় – এই বোতামগুলো চাপার মানে কী? এই কাজের মানে কী? এই টাকা রোজগারের মানে কী?

সহকর্মী রিফাত এসে বলে, “কেমন আছো?” আমি বলি, “ভালো।” কিন্তু “ভালো” শব্দটা মুখ থেকে বের হতেই মনে হয় – আমি মিথ্যা বলছি। কিন্তু সত্যি বলব কী? বলব – “আমি মনে করতে পারছি না আমি কে? আমি কেন এখানে আছি?”

দুপুরে খাবার সময় হয়। কিন্তু খিদে নেই। খাবার দেখলে মনে হয় – এগুলো পেটে দিয়ে কী হবে? এগুলো তো আবার বের করে দিতে হবে। তাহলে ভিতরে নেওয়ার মানে কী?

বিকেলে হ্যাপি ফোন করে। বলে, “বাজার করে আনবে?” আমি বলি, “আনব।” কিন্তু বাজারে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। মনে হয় – এই সব্জিগুলো আজ কিনলাম, কাল খাব, পরশু ফেলে দেব। তাহলে কেনার মানে কী?

সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরি। আরাশ ছুটে আসে। বলে, “বাবা, আজ স্কুলে কী হয়েছে জানো?” আমি তার কথা শুনি, কিন্তু মনে হয় সে যেন অন্য কোনো ভাষায় কথা বলছে। সব শব্দ পরিচিত, কিন্তু অর্থ নেই।

রাতে বিছানায় শুই। চোখ বুজি। কিন্তু মাথার ভিতর একটা আওয়াজ – “তুমি কে? তুমি কেন আছো? তোমার থাকার মানে কী?” এই প্রশ্নগুলো ঘুরতে থাকে। ঘুরতে থাকে। ঘুরতে থাকে।

কখনো কখনো মনে হয় – আমি একটা নাটকে অভিনয় করছি। কিন্তু আমি জানি না আমার সংলাপ কী। জানি না আমার চরিত্র কী। জানি না নাটকটা কবে শেষ হবে।

এই বিষণ্ণতা একটা দেশের মতো। যেখানে শুধু আমি আছি। আর কেউ নেই। সেখানে রোদ ওঠে না। বৃষ্টি হয় না। সময় যায় না। কেবল একটা ধূসর আলো, একটা নিরব হাওয়া।

হ্যাপি বলে, “ডাক্তার দেখাও।” কিন্তু ডাক্তার কী বুঝবে? সে কি বুঝবে যে আমার মনে হয় পৃথিবীটা একটা থিয়েটার? আর আমি হচ্ছি সেই দর্শক যে ভুল হলে ঢুকে গেছে?

মাঝে মাঝে ভাবি – হয়তো এটা স্বাভাবিক। হয়তো সবাই এভাবেই বাঁচে। শুধু আমি প্রথমবার টের পাচ্ছি। হয়তো জীবন বলতে এটাই বোঝায় – একটা ভান করে যাওয়া যে সব কিছুর অর্থ আছে।

কিন্তু তাহলে অর্থ খুঁজতে হয় কেন? তাহলে এই খোঁজাটাই কি অর্থ?

আজ আবার সকাল হয়েছে। আবার সেই একই নিয়ম। উঠতে হবে। ব্রাশ করতে হবে। অফিস যেতে হবে। আবার সেই একই নাটক।

কিন্তু আজ একটু অন্যরকম লাগছে। আজ মনে হচ্ছে – হয়তো এই নাটকেই আমার অস্তিত্ব। হয়তো অভিনয় করতে করতেই একদিন আসল হয়ে উঠব।

বা হয়তো না।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *