আজ সকালে দোকানে গিয়ে দেখলাম একটা ছোট ছেলে দোকানদারকে বলছে, “আমার মা ১০০ টাকার চিনি বলেছে।” কিন্তু তার হাতে ৫০ টাকা। দোকানদার জিজ্ঞেস করল, “বাকি টাকা?” ছেলেটা বলল, “মা বলেছে পরে দেবে।”
ছেলেটার চোখে দেখলাম অদ্ভুত একটা ভাব। ভয় আর অপরাধবোধ মিশ্রিত। তার মুখে লেগে আছে তার প্রথম মিথ্যার স্বাদ।
আমার ভিতরে একটা অ্যাপ খুলে গেল যার নাম “নির্দোষতার শেষ দিন ভার্সন শৈশব”।
বাসে উঠে দেখি একজন যাত্রী টিকিট কর্মচারীকে বলছে, “ভাই, আমার পকেট কাটা গেছে। টাকা নাই।” কিন্তু আমি দেখেছি সে আগে ফোনে কারো সাথে দামি খাবারের দোকানের কথা বলছিল।
এই মানুষটার মুখে কোনো অস্বস্তি নেই। মিথ্যা বলা তার কাছে স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
চিকিৎসালয়ে গিয়ে দেখি একটা রোগী ডাক্তারকে বলছে, “ডাক্তার সাহেব, আমি একদমই ধূমপান করি না।” কিন্তু তার জামার পকেটে সিগারেটের প্যাকেট স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
তার কণ্ঠে কোনো দ্বিধা নেই। অভিজ্ঞ মিথ্যাবাদী।
কার্যালয়ে দেখি একজন কর্মচারী প্রধানকে বলছে, “সাহেব, আমার দাদি খুব অসুস্থ। আমাকে গ্রামে যেতে হবে।” কিন্তু আমি জানি সে গানের অনুষ্ঠানের টিকিট কিনেছে।
তার অভিনয় নিখুঁত। কোনো অপরাধবোধ নেই।
বিদ্যালয়ের সামনে দিয়ে যেতে যেতে দেখি একটা বাচ্চা শিক্ষিকাকে বলছে, “ম্যাডাম, আমার বাড়ির কাজের খাতা কুকুরে খেয়ে ফেলেছে।” শিক্ষিকা হেসে বলল, “তোমার তো কোনো কুকুর নেই।” বাচ্চাটা লাল হয়ে গেল।
এই বাচ্চাটা এখনো মিথ্যায় দক্ষ হয়নি। এখনো তার মধ্যে লজ্জা আছে।
বাজারে দেখি একটা ক্রেতা দোকানদারকে বলছে, “ভাই, এই জিনিস আমার স্ত্রী পছন্দ করেনি। ফেরত দিতে চাই।” কিন্তু জিনিসটা স্পষ্টতই ব্যবহার করা।
দোকানদার বুঝেও না বোঝার ভান করল। দুজনেই মিথ্যার খেলা খেলছে।
ব্যাংকে গিয়ে দেখি একজন মহিলা কর্মকর্তাকে বলছে, “আমার এখনই ঋণ লাগবে। আমার স্বামী রোগশয্যায়।” কিন্তু তার সাজসজ্জা দেখে মনে হচ্ছে না জরুরি অবস্থা।
কর্মকর্তাও জানে এটা মিথ্যা। কিন্তু সবাই নিজের নিজের কাজ করে যাচ্ছে।
খাবারের দোকানে গিয়ে দেখি একটা দম্পতি পরিবেশনকারীকে বলছে, “আমাদের খাবারে চুল ছিল।” কিন্তু তারা প্রায় সব খেয়ে ফেলেছে।
পরিবেশনকারীও বুঝেছে। কিন্তু তর্ক করছে না। মিথ্যা এখন ব্যবসার কৌশল।
ট্রাফিক পুলিশের কাছে দেখি একজন চালক বলছে, “সাহেব, আমার বাচ্চা রোগশয্যায়। তাই একটু গতি করেছি।” কিন্তু তার গাড়িতে কোনো উৎকণ্ঠার চিহ্ন নেই।
পুলিশও রুটিনমতো জরিমানা করে দিল। সবাই জানে সবাই মিথ্যা বলছে।
আমার নিজের প্রথম মিথ্যার কথা মনে পড়ল। তৃতীয় শ্রেণিতে পরীক্ষায় ফেল করে বাবাকে বলেছিলাম, “আমার খাতা হারিয়ে গেছে।” সেদিন রাতে কত যে কেঁদেছিলাম। অপরাধবোধে ঘুম হয়নি।
আজ আমি প্রতিদিন ছোটখাটো মিথ্যা বলি। “যানজট ছিল।” “ফোনের সংযোগ ছিল না।” “আমি সময়মতো বের হয়েছিলাম।”
আর কোনো অপরাধবোধ লাগে না।
নামাজ পড়ে ভাবছিলাম। প্রথম মিথ্যা বলার সময় যে অপরাধবোধ হয়েছিল, সেটা ছিল আমার বিবেকের চিৎকার। কিন্তু আমি সেই চিৎকার উপেক্ষা করতে করতে বধির হয়ে গেছি।
প্রথম মিথ্যার স্বাদ তিক্ত ছিল। কিন্তু আমরা চিনির আস্তরণ দিয়ে দিয়ে সেটাকে মিষ্টি বানিয়ে ফেলেছি।
এখন মিথ্যা আমাদের কাছে বেঁচে থাকার কৌশল। সুবিধার হাতিয়ার। সামাজিক তেল।
কিন্তু সেই প্রথম দিনে যে ছোট ছেলেটা ছিল আমার মধ্যে, সে কি এখনো কাঁদছে?
হয়তো আমাদের সবার ভিতরে একটা ছোট বাচ্চা আছে, যে এখনো জানে মিথ্যার আসল স্বাদ।
তার কান্না শুনতে পাই না আমরা। কারণ আমরা নিজেদের কান বন্ধ করে রেখেছি।
একটু ভাবনা রেখে যান