পুরনো ফটো দেখছিলাম। ল্যাপটপের স্ক্রিনে একটা পারিবারিক অনুষ্ঠান। পাঁচ বছর আগের।
ছবিতে আমি নীল শার্ট পরে আছি।
নীল?
আমি লাল শার্ট পরেছিলাম সেদিন। লাল। নিশ্চিত।
আবার ছবিতে তাকালাম। নীল। গাঢ় নীল।
কিন্তু আমার মনে আছে। সকালে আলমারি খুলে লাল শার্টটা বের করেছিলাম। কাপড়ের গন্ধ। নতুন ছিল। ইস্ত্রি করা। গায়ে পরে আয়নায় দেখেছিলাম। ভালো লেগেছিল।
অনুষ্ঠানে চাচি বলেছিলেন, “লাল রঙ তোর ভালো মানায়।”
আমি বলেছিলাম, “ধন্যবাদ।”
সব মনে আছে। লাল শার্ট।
কিন্তু ছবিতে নীল।
হ্যাপিকে ডাকলাম। “এটা দেখো।”
হ্যাপি তাকালো। “কী?”
“আমি কী রঙের শার্ট পরে আছি?”
“নীল।”
“তোমার মনে আছে সেদিন?”
হ্যাপি মাথা নাড়লো। “না। মনে নেই।”
“আমার মনে আছে লাল পরেছিলাম।”
হ্যাপি আবার ছবি দেখল। “ছবিতে তো নীল।”
“জানি। কিন্তু আমার মনে লাল।”
হ্যাপি চুপ করে রইল। তারপর বলল, “তাহলে হয়তো তোমার ভুল মনে আছে।”
হয়তো। কিন্তু এত স্পষ্ট কীভাবে ভুল হয়?
সেই রাতে ঘুম হলো না। শুয়ে ভাবছিলাম। লাল শার্ট। কাপড়ের অনুভূতি। সেলাইয়ের সুতা। সব মনে আছে।
কিন্তু ছবি মিথ্যা বলে না।
তাহলে আমি মিথ্যা বলছি?
না। আমি মিথ্যা বলছি না। আমি বিশ্বাস করি।
তাহলে?
পরদিন সকালে আলমারি খুললাম। লাল শার্ট খুঁজলাম। নেই।
নীল শার্ট আছে। সেই গাঢ় নীল।
হাতে নিয়ে দেখলাম। চেনা লাগছে না।
আরাশ জিজ্ঞেস করল, “কী খুঁজছো?”
“একটা শার্ট।”
“কোন শার্ট?”
“লাল।”
“তোমার লাল শার্ট নেই তো।”
থমকে গেলাম। “কী বললি?”
“তোমার লাল শার্ট নেই। আম্মু বলেছে তুমি লাল পরো না।”
আমি কিছু বললাম না। আলমারি বন্ধ করলাম।
আরাশ চলে গেল।
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।
লাল শার্ট নেই। কখনো ছিল না?
তাহলে যেটা মনে আছে, সেটা কী?
শৈশবের একটা স্মৃতি আছে। দাদুর সাথে নদীতে গিয়েছিলাম। মাছ ধরতে।
বিকেল ছিল। রোদ নরম। নদীর পানি ঠান্ডা। দাদু বসে ছিলেন পাথরের ওপর। আমি পাশে।
দাদু বলেছিলেন, “ধৈর্য ধরতে হবে। মাছ তাড়াতাড়ি আসে না।”
আমি বলেছিলাম, “কতক্ষণ?”
“যতক্ষণ লাগে।”
বসে ছিলাম। পানির শব্দ শুনছিলাম। দাদুর নিঃশ্বাস। ধীর।
মাছ ধরা হয়নি সেদিন। কিন্তু ভালো লেগেছিল।
দাদুর হাত মনে আছে। বড়। শক্ত। কিন্তু নরম।
দাদুর গন্ধ মনে আছে। তামাকের। মাটির।
সব মনে আছে।
বছর দশেক আগে মা বলেছিলেন, “তোর দাদু তো তোর জন্মের আগেই মারা গেছেন। তুই ওনাকে কখনো দেখিসনি।”
আমি বলেছিলাম, “না। আমি দেখেছি। নদীতে গিয়েছিলাম ওনার সাথে।”
মা হেসেছিলেন। “ওটা তোর কল্পনা। তুই ছবি দেখে দেখে ভেবেছিস।”
“না। আমি গিয়েছিলাম।”
মা আর কিছু বলেনি। কিন্তু চোখ বলছিল, বিশ্বাস করছে না।
আমিও চুপ করে গিয়েছিলাম।
কিন্তু এখনো বিশ্বাস করি। গিয়েছিলাম। নদীতে। দাদুর সাথে।
কীভাবে এত স্পষ্ট মনে থাকে যেটা হয়নি?
হ্যাপি একদিন বলল, “তুমি অনেক কিছু মনে করো যেগুলো হয়নি।”
“যেমন?”
“যেমন তুমি বলো তোমার প্রথম দিন স্কুলে কেঁদেছিলে। কিন্তু তোমার মা বলেছে তুমি খুব খুশি ছিলে।”
“আমার মনে আছে। কেঁদেছিলাম।”
“কীভাবে মনে আছে?”
থেমে গেলাম। কীভাবে মনে আছে?
মনে আছে মায়ের হাত ছেড়ে দিতে চাইনি। মনে আছে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কেঁদেছিলাম। মনে আছে শিক্ষক এসে হাত ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন।
সব মনে আছে।
কিন্তু হয়নি?
বললাম, “হয়তো তোমার মা ভুল বলেছে।”
হ্যাপি কিছু বলল না।
আরাশ একবার বলল, “নানু কেমন ছিলেন?”
নানু। মা।
বললাম, “ভালো ছিলেন।”
“কী করতেন?”
“গল্প বলতেন। রান্না করতেন। হাসতেন অনেক।”
আরাশ বলল, “আমার মনে নেই।”
“তুই ছোট ছিলি।”
“কত ছোট?”
“দুই বছর।”
আরাশ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “তাহলে আমার মনে থাকার কথা না?”
“না।”
“কিন্তু মনে আছে কিছু কিছু।”
তাকালাম। “কী মনে আছে?”
“নানু আমাকে কোলে নিয়েছিলেন। গান গেয়েছিলেন। আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।”
আমি কিছু বললাম না।
আরাশ বলল, “এটা কি সত্যি? নাকি আমি ভুল মনে করছি?”
“জানি না।”
“কিন্তু তুমি তো দেখেছো। আমাকে বলো।”
দেখেছি কি না মনে নেই। কিন্তু হতে পারে। হয়তো হয়েছে। হয়তো হয়নি।
বললাম, “হয়তো হয়েছে।”
আরাশ সন্তুষ্ট হলো না। “হয়তো মানে?”
“মানে আমি নিশ্চিত না।”
আরাশ চলে গেল। কিন্তু প্রশ্নটা রয়ে গেল।
কাকিমা এসেছিলেন। গল্প করছিলেন। “তোর মনে আছে তো, তুই কত সাহসী ছিলি? ওই বড় কুকুরটার সাথে খেলতি।”
আমার মনে নেই।
কাকিমা বলে যাচ্ছিলেন, “কালো কুকুর। বিশাল। সবাই ভয় পেত। কিন্তু তুই খেলতি। ওর লোম ধরে টানতি।”
মনে করার চেষ্টা করলাম। নেই। কিছুই নেই।
কাকিমা বলল, “তোর মনে নেই?”
“না।”
“অদ্ভুত। তুই তো রোজ খেলতি।”
কাকিমা চলে গেলেন। কিন্তু সেই রাতে ঘুমের মধ্যে দেখলাম। কালো কুকুর। লোম। নরম। আমি ছোট। হাত দিয়ে ছুঁচ্ছি।
পরদিন মনে হলো, হ্যাঁ, এটা মনে আছে।
কিন্তু কাল পর্যন্ত তো মনে ছিল না।
তাহলে এখন কীভাবে মনে আছে?
হ্যাপি বলল, “তুমি নতুন স্মৃতি তৈরি করছো।”
“কীভাবে?”
“কাকিমা বলেছে। তুমি শুনেছো। এখন মনে হচ্ছে তোমার নিজের।”
“কিন্তু আমি তো দেখছি। স্পষ্ট দেখছি।”
“দেখছো মানে মনে করছো।”
“একই কথা না?”
হ্যাপি বলল, “না।”
তারপর থেকে নিজের স্মৃতি বিশ্বাস করতে ভয় হয়।
কোনটা আসলে হয়েছিল? কোনটা মনে হচ্ছে হয়েছিল?
সাইফুল একবার বলেছিল, “মনে আছে আমরা একসাথে পাহাড়ে গিয়েছিলাম?”
“কখন?”
“দশ বছর আগে। তুই, আমি, বাবু।”
মনে করার চেষ্টা করলাম। অস্পষ্ট কিছু।
সাইফুল বলল, “আমরা হারিয়ে গিয়েছিলাম। তুই কাঁদছিলি।”
“আমি কাঁদিনি।”
“কেঁদেছিলি। আমি দেখেছি।”
“না।”
সাইফুল হাসল। “ঠিক আছে। হয়তো তুই কাঁদিসনি। হয়তো বাবু কেঁদেছিল। এখন আর মনে নেই।”
মনে নেই। সাইফুলেরও মনে নেই। আমারও মনে নেই।
তাহলে হয়েছিল কিছু? নাকি আমরা সবাই ভুল মনে করছি?
হ্যাপি জিজ্ঞেস করল একদিন, “তোমার কি মনে আছে আমাদের প্রথম দেখা?”
“হ্যাঁ।”
“কী মনে আছে?”
“তুমি লাল শাড়ি পরেছিলে। চুল খোলা। হাসছিলে।”
হ্যাপি চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আমি নীল শাড়ি পরেছিলাম। চুল বেঁধেছিলাম। হাসিনি। খুব নার্ভাস ছিলাম।”
তাকালাম। “নিশ্চিত?”
“নিশ্চিত। ছবি আছে।”
ছবি দেখালো। নীল শাড়ি। চুল বাঁধা। মুখ গম্ভীর।
আমি বললাম, “কিন্তু আমার মনে…”
হ্যাপি বলল, “তোমার মনে যেটা আছে, সেটা তুমি চেয়েছিলে। লাল শাড়ি। খোলা চুল। হাসি। কিন্তু হয়নি।”
চুপ করে রইলাম।
হ্যাপি বলল, “কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। তুমি আমাকে ভালোবেসেছিলে। সেটা সত্যি।”
রাতে শুয়ে ভাবলাম। কোনটা সত্যি?
লাল শাড়ি, নাকি নীল শাড়ি?
লাল শার্ট, নাকি নীল শার্ট?
দাদুর সাথে নদী, নাকি শুধু ছবি?
কোনটা?
আরাশ একবার জিজ্ঞেস করল, “আমার কি মনে থাকবে এখনকার সময়?”
“কোন সময়?”
“এখন। তুমি আমার সাথে বসে আছো। গল্প বলছো। এই সময়।”
“হ্যাঁ। মনে থাকবে।”
“কতটুকু মনে থাকবে?”
“জানি না। কিছু কিছু থাকবে।”
আরাশ বলল, “আমি সব মনে রাখতে চাই।”
“সব মনে থাকে না।”
“কেন?”
“মস্তিষ্ক সব রাখে না। কিছু ফেলে দেয়।”
আরাশ বলল, “তাহলে কী রাখে?”
“যেটা দরকার মনে হয়।”
“দরকার কে ঠিক করে?”
থেমে গেলাম। দরকার কে ঠিক করে?
আমি? আমার মস্তিষ্ক? নাকি অন্য কিছু?
বললাম, “জানি না।”
আরাশ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “তাহলে যেটা মনে থাকে, সেটা সত্যি নাও হতে পারে?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে কিছুই সত্যি না?”
আমি কিছু বলতে পারলাম না।
আরাশ বলল, “কিন্তু তোমার তো মনে আছে আমি কেমন ছিলাম ছোটবেলায়?”
“হ্যাঁ।”
“সেটা সত্যি? নাকি তুমি ভুল মনে করছো?”
“জানি না।”
আরাশ একটু চুপ করে রইল। তারপর বলল, “তাহলে আমিও হয়তো আমার নিজের কথা ভুল মনে করব?”
“হ্যাঁ। হতে পারে।”
আরাশ আর কিছু বলল না। উঠে গেল।
আমি বসে রইলাম।
ভাবলাম, আরাশ বড় হবে। স্মৃতি তৈরি হবে। হয়তো ভুল স্মৃতি। হয়তো ঠিক স্মৃতি।
কিন্তু সে জানবে না কোনটা কোনটা।
আমার মতো।
হ্যাপি বলল, “তুমি খুব ভাবো এসব নিয়ে।”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
“কারণ আমি নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছি না।”
হ্যাপি বলল, “নিজেকে বিশ্বাস করতেই হবে এমন কোনো কথা নেই।”
“তাহলে কাকে বিশ্বাস করব?”
হ্যাপি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “কাউকে না। শুধু মেনে নাও।”
“কী মেনে নেব?”
“যেটা মনে আছে, সেটা হয়তো হয়নি। কিন্তু তুমি তো বেঁচে আছো। এখন। এই মুহূর্তে।”
এই মুহূর্তে।
হ্যাঁ। এই মুহূর্তে বেঁচে আছি।
কিন্তু এই মুহূর্তটাও তো কাল স্মৃতি হবে।
তখন এটাও কি ভুল মনে হবে?
রাতে আবার সেই ল্যাপটপের ছবি দেখলাম। পাঁচ বছর আগের।
নীল শার্ট।
এখনো মনে হচ্ছে লাল ছিল।
কিন্তু জানি, ছবি মিথ্যা বলে না।
তাহলে আমি মিথ্যা বলছি? নিজের কাছে?
হয়তো।
হয়তো আমরা সবাই মিথ্যা বলি। নিজেদের কাছে। প্রতিদিন।
এবং বিশ্বাস করি।
ছবিটা বন্ধ করলাম।
অন্ধকারে শুয়ে রইলাম।
হ্যাপি ঘুমাচ্ছে। আরাশ ঘুমাচ্ছে।
আমি জেগে আছি।
ভাবছি।
লাল শার্ট। দাদুর হাত। নদীর শব্দ। মায়ের হাত ছাড়া। কালো কুকুর।
সব মনে আছে।
কিন্তু কোনটা সত্যি?
জানি না।
হয়তো কিছুই সত্যি না।
হয়তো সবই সত্যি।
হয়তো সত্যি মিথ্যা বলে কিছু নেই। শুধু আছে যেটা মনে আছে।
এবং যেটা মনে নেই।
চোখ বন্ধ করলাম।
ঘুমের মধ্যে দেখলাম। লাল শার্ট পরে আছি। দাদু পাশে বসে আছেন।
নদীর শব্দ ভেসে আসছে।
দাদু বলছেন, “ধৈর্য ধরতে হবে।”
আমি বলছি, “কতক্ষণ?”
দাদু বলছেন, “যতক্ষণ লাগে।”
ঘুম ভাঙল ভোরে।
স্বপ্ন মনে আছে।
স্পষ্ট মনে আছে।
কিন্তু এটা কি স্মৃতি? নাকি স্বপ্ন?
নাকি একই জিনিস?
জানি না।
উঠে গেলাম।
আয়নায় তাকালাম।
চেহারা চেনা। কিন্তু অচেনাও।
এই মানুষটা কে? যার স্মৃতি নিজের না।
এই মানুষটা কে? যে বিশ্বাস করে যা হয়নি।
এই মানুষটা কে?
আমি? নাকি অন্য কেউ?
জানি না।
আয়না থেকে সরে এলাম।
হ্যাপি উঠেছে। চা করছে।
“ঘুম হয়েছিল?” জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ।”
“স্বপ্ন দেখেছিলে?”
“হ্যাঁ।”
“কী দেখেছিলে?”
“মনে নেই।”
মিথ্যা বললাম।
মনে আছে। স্পষ্ট মনে আছে।
কিন্তু বললাম না।
কারণ বললে হয়তো স্মৃতি হয়ে যাবে।
এবং তখন জানব না, হয়েছিল নাকি দেখেছিলাম।
চা খেলাম।
আরাশ উঠল। স্কুলে যাবে।
“কাল কী করেছিলি?” জিজ্ঞেস করলাম।
আরাশ ভাবল। “মনে নেই।”
“কিছুই মনে নেই?”
“না। খেয়েছি। খেলেছি। ঘুমিয়েছি। বাকি মনে নেই।”
“ভালো লেগেছিল?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
আরাশ বলল, “জানি না। হয়তো তুমি ছিলে।”
চলে গেল।
আমি বসে রইলাম।
হয়তো তুমি ছিলে।
এটা কি স্মৃতি হবে আরাশের? আমি ছিলাম?
নাকি ভুল মনে হবে? আমি ছিলাম না?
জানি না।
কিন্তু এখন আছি। এই মুহূর্তে।
হয়তো এটাই যথেষ্ট।
হয়তো না।
জানি না।
একটু ভাবনা রেখে যান