ব্লগ

মিথ্যা হাসির আলোকচিত্র

নভেম্বর ২০২৫ · 4 মিনিটে পড়া
শেয়ার

“ছবি তুলবো। সবাই একসাথে দাঁড়াও।”

হ্যাপি ফোনটা তুলে নিল। আমি, আরাশ, হ্যাপি—তিনজন দাঁড়ালাম। কিন্তু আমাদের মুখে স্বাভাবিক হাসি নেই।

“হাসো,” হ্যাপি বলল।

আমরা হাসলাম। কিন্তু সেই হাসি আসল হাসি নয়। সেই হাসি ছবির জন্য।


আমি ভাবি, আমাদের পারিবারিক ছবিগুলো দেখে কেউ কি বুঝতে পারবে আমাদের আসল অবস্থা?

আমাদের সব ছবিতে আমরা হাসছি। কিন্তু সেই হাসির পেছনে কত কষ্ট, কত চিন্তা, কত দুশ্চিন্তা লুকানো আছে—সেটা ছবিতে ধরা পড়ে না।

গত সপ্তাহে আমাদের একটা ছবি তোলা হয়েছিল। সেদিন সকালে আমার চাকরি চলে গিয়েছিল। কিন্তু ছবিতে আমি হাসছি। কারণ ছবিতে কষ্ট দেখানো যায় না।

হ্যাপি প্রায়ই বলে, “একটা ছবি তুলি।” কিন্তু সেই “ছবি তুলি” এর মানে হলো “খুশি দেখাই।”

আমি মাঝে মাঝে ভাবি, এই ছবিগুলো কার জন্য? আমাদের নিজেদের জন্য? নাকি অন্যদের দেখানোর জন্য?

আরাশের জন্মদিনের ছবি আছে। সেই ছবিতে আমরা তিনজনেই হাসছি। কিন্তু সেদিন আমার মাথা ব্যথা ছিল। হ্যাপির জ্বর ছিল। আরাশ মন খারাপ করে ছিল কারণ তার প্রিয় খেলনা ভেঙে গিয়েছিল।

কিন্তু ছবিতে এসব কিছু নেই। ছবিতে শুধু তিনটা হাসিমুখ।

আমি বুঝি, ছবি তোলার সময় আমরা অভিনয় করি। আমরা সেই মুহূর্তে যা অনুভব করছি, সেটা নয়। আমরা দেখাই যা আমাদের দেখানো উচিত।

ছবির জন্য হাসি একটা সামাজিক নিয়ম। কেউ কষ্টের মুখ নিয়ে ছবি তোলে না।

কিন্তু এই মিথ্যা হাসি আমাদের আসল স্মৃতি নষ্ট করে দেয়। আমরা যখন পুরনো ছবি দেখি, মনে হয় আমরা সব সময় খুশি ছিলাম।

আমাদের সব ছবি একই রকম। তিনটা হাসিমুখ। কিন্তু আমাদের জীবন তো তিনটা হাসিমুখ নয়। আমাদের জীবনে কান্না আছে, রাগ আছে, ক্লান্তি আছে।

সেসব ছবিতে থাকে না।

আমি একবার হ্যাপিকে বলেছিলাম, “চলো, স্বাভাবিক মুখে একটা ছবি তুলি।”

হ্যাপি বলেছিল, “স্বাভাবিক মুখে কেন? ছবি তো খুশির জন্য।”

আমি বুঝেছিলাম, আমাদের মনে ছবি মানেই খুশি। ছবি মানেই উৎসব।

কিন্তু জীবন তো শুধু উৎসব নয়। জীবনে দুঃখও আছে। সেই দুঃখও কি আমাদের স্মৃতির অংশ নয়?

আমি ভাবি, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যখন আমাদের ছবি দেখবে, তারা কি ভাববে আমরা সব সময় খুশি ছিলাম? তারা কি বুঝবে না যে আমাদের সংগ্রাম ছিল?

আরাশ যখন বড় হবে, আমাদের ছবি দেখে কি ভাববে তার শৈশব সুখের ছিল? কিন্তু সে কি জানবে সেই সুখের পেছনে কত পরিশ্রম, কত ত্যাগ ছিল?

আমি মাঝে মাঝে চাই আমাদের একটা আসল ছবি থাকুক। যেখানে আমি ক্লান্ত দেখাই। হ্যাপি চিন্তিত দেখায়। আরাশ মন খারাপ করে আছে।

কিন্তু এমন ছবি কেউ তোলে না। তুললেও রাখে না।

আমাদের ফোনে শত শত ছবি আছে। কিন্তু সব ছবিতে একই মিথ্যা হাসি। একই কৃত্রিম খুশি।

আমি ভাবি, এই ছবিগুলো আমাদের জীবনের ডকুমেন্ট নাকি আমাদের জীবনের বিজ্ঞাপন?

হয়তো আমরা নিজেদের কাছেই প্রমাণ করার চেষ্টা করি যে আমরা খুশি। হয়তো এই ছবিগুলো আমাদের আশার প্রমাণ। আমরা যা হতে চাই, সেটার প্রমাণ।

কিন্তু আমি জানি, আসল জীবন ছবির চেয়ে জটিল। আসল জীবনে শুধু হাসি নেই। আসল জীবনে রঙের পাশাপাশি ধূসর রঙও আছে।

আজ আবার হ্যাপি বলল, “ছবি তুলি।”

আমি হাসলাম। কিন্তু এবার চেষ্টা করলাম সেই হাসিতে একটু সত্যতা মেশাতে।

কারণ মিথ্যা হাসি হলেও, আমরা যে একসাথে আছি, এটাই তো আমাদের সবচেয়ে বড় সত্য।

hayder

লেখক। পর্যবেক্ষক। যে বিশ্বাস করে নীরব জিনিসগুলোরও একটা কণ্ঠস্বর থাকা উচিত।

আরও পড়ুন

একটু ভাবনা রেখে যান

Your email address will not be published. Required fields are marked *